1. md.zihadrana@gmail.com : admin :
পরিসংখ্যানে পড়ে শাহজাহান হয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানী! - দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ

২৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ । সন্ধ্যা ৭:৫৬ ।। গভঃ রেজিঃ নং- ডিএ-৬৩৪৬ ।।

সংবাদ শিরোনামঃ
গণপূর্তের ইএম কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইউসুফের ভুয়া বিল ও কমিশন বাণিজ্য কার বলে বলিয়ান এলজিইডির বাবু নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আনসার এবং দালালদের চলছে প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য  বেনাপোল কাস্টমস কর্মকর্তা এসি নুরের অবাধ ঘুষ বাণিজ্য গুচ্ছের পছন্দক্রমে সর্বোচ্চ আবেদন জবিতে টঙ্গীর মাদক সম্রাজ্ঞী আরফিনার বিলাসবহুল বাড়ী-গাড়ী রেখে থাকেন বস্তিতে! শরীয়তপুরে কিশোরীকে অপহরণের পর গনধর্ষণ বেনাপোল কাস্টমসে ফুলমিয়া নাজমুল সিন্ডিকেটের ডিএম ফাইলে অবাধ ঘুষ বাণিজ্য নারীঘটিত কারন দেখিয়ে জবির ইমামকে অব্যাহতি, শিক্ষার্থীরা বলছে সাজানো নাটক মিটফোর্ডের জিনসিন জামান এখন ইমপেক্স ল্যাবরেটরীজ (আয়) এর গর্বিত মালিক
পরিসংখ্যানে পড়ে শাহজাহান হয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানী!

পরিসংখ্যানে পড়ে শাহজাহান হয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানী!

স্টাফ রিপোর্টার॥
পরিসংখ্যানে পড়ে শাহজাহান হয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানী,  কৃষি বিষয়ে কখনো পড়াশোনা করেননি তিনি। অথচ পরিচয় দিচ্ছেন ‘দেশের বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী’। ধান নিয়ে গবেষণায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকলেও তিনি ‘ধানবিজ্ঞানী’। পরিসংখ্যানবিদ হয়েও অলংকৃত করছেন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদ। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই যেমন খুশি তেমনভাবে চালাচ্ছেন প্রতিষ্ঠান। তার দাপটে প্রকৃত কৃষিবিদ আর বিজ্ঞানীরা হয়ে পড়েছেন অসহায়।

তিনি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর। ‘বাদশাহ শাহজাহান’-এর মতো তার একক শাসনে চলছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ প্রতিষ্ঠান। তার বিরুদ্ধে আছে নিয়োগে কারসাজি, বদলি-পদোন্নতিতে স্বেচ্ছাচারিতা, অতিরিক্ত কাজের নামে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, বিজ্ঞানীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ অনিয়মের অসংখ্য অভিযোগ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে একাধিকবার নানা অনিয়মের প্রমাণ মিললেও রহস্যজনক কারণে কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি তাকে। উল্টো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন শাহজাহান কবীর।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রির মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগ তদন্তে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আবদুর রৌফ। ২০২১ সালের জুনে তাকে প্রধান রেখেই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। গত বছর এপ্রিলে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কমিটি। এরপর ১০ মাস পার হলেও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তদন্ত চলাচলেই তার পদমর্যাদা বাড়িয়ে গ্রেড-১ করা হয়।

ওই তদন্ত কমিটির প্রধান ড. মো. আবদুর রৌফ গত বছর জুনে অবসরে গেছেন। জানতে চাইলে  তিনি বলেন, ‘বিস্তারিত তদন্ত শেষে গত বছর মার্চ-এপ্রিলের দিকে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। যেসব অভিযোগ নিয়ে আমরা তদন্ত করেছিলাম, তার অনেকই প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। কত টাকা সরকারের ক্ষতি হয়েছে—তা আদায় করতে বলা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা, আমার জানা নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রিতে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই দাবি করে মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তার কোনোটিরই কোনো ভিত্তি নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির কাছে প্রতিটি বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম। একটা বিষয়ও

এমন নেই, যার যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করিনি। পরবর্তীকালে তদন্ত কমিটি কী প্রতিবেদন দিয়েছেন সে বিষয়ে আমার জানা নেই। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কিনা, তাও আমাকে জানানো হয়নি।

পরিসংখ্যানে পড়ে ‘কৃষিবিজ্ঞানী’ : জানা গেছে, ড. শাহজাহান কবীর কৃষি বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করেননি। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে ১৯৮৭ সালে অনার্স ও ১৯৮৮ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পিএইচডি গবেষণা করেছেন ‘জিও-স্ট্যাটিসটিক্যাল মডেলিং’-এর ওপর। অথচ ব্রির ওয়েবসাইটে মহাপরিচালকের পরিচিতিতে তাকে ‘দেশের বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী’ ও ‘ধানবিজ্ঞানী’ বিশেষণ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া কালবেলাকে বলেন, ‘প্রকৃত অর্থে যিনি যে লাইনের মানুষ, তার পরিচিতি সেভাবেই তুলে ধরা উচিত। এর অন্যথা করা নৈতিক নয়।

বিজ্ঞানী মেরে শুরু উত্থান :

২০১৩ সালের ২২ জুলাই ধান গবেষণার কয়েকজন বিজ্ঞানীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে কিছু শ্রমিক। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়। তদন্তে এ ঘটনার ‘মূল পরিকল্পনাকারী ও ইন্ধনদাতা’ হিসেবে তৎকালীন পরিসংখ্যান বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাহজাহান কবীরকে চিহ্নিত করা হয়। ওই ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে তাকে রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ে বদলি করা হয়। তবে তিনি নতুন কর্মস্থলে না গিয়ে সদর দপ্তরে অবস্থান করেন কয়েক মাসের মধ্যেই পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারণ পরিচর্যা) পদে পদোন্নতি পান।

অভিযোগ রয়েছে, পরিচালক হওয়ার পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে জনবল নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় কৃষি মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ড. শাহজাহান কবীরের ‘ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড অব্যাহতভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা এবং বিতর্কিত এ কর্মকর্তাকে নিয়োগের কোনো পর্যায়েই সম্পৃক্ত না করা’র সুপারিশ করে। এসব ঘটনার পরও তাকে মহাপরিচালকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ধান গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসার পর আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শাহজাহান কবীর। সিনিয়র বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার দুর্ব্যবহারের বিষয়টি প্রায় নিয়মিত। ডিজির এমন আচরণে অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ২০২০ সালে তৎকালীন পরিচালক (গবেষণা) তমাল লতা আদিত্যের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু এবং ব্রি ধান-৮৯ উদ্ভাবনের জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীদের দলনেতা জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান ড. এনামুল হকের অসুস্থতার জন্য ব্রির উগ্র আচরণকে দায়ী করেন তাদের ঘনিষ্ঠজনরা।

জানা গেছে, ব্রির বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশই এখন কোণঠাসা হয়ে আছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে একসময় সবচেয়ে প্রাণবন্ত ছিল বিজ্ঞানী সমিতির কার্যালয়। বর্তমানে এ সমিতির কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা। গত তিন বছরে সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির অধিকাংশ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্রিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কমিটিতে জায়গা পান না বিজ্ঞানী সমিতির নেতারা। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্রিতে আগমন উপলক্ষে গঠিত বিভিন্ন উপকমিটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিজ্ঞানী সমিতির সভাপতি বাদে অন্য কাউকে এসব কমিটিতে রাখা হয়নি। সমিতির সভাপতি ড. আমিনা খাতুনের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিবারিক সম্পর্কের কারণে মহাপরিচালকের কাছে তিনি বেশি গুরুত্ব পান।

নিয়োগ পরীক্ষায় কারসাজি
ব্রিতে ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের ২৬টি ক্যাটাগরিতে ৫২ জন কর্মী নিয়োগের জন্য ২০২২ সালের ১৫ জুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। লিখিত পরীক্ষার পর গত ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। এ বছরের ৯ জানুয়ারি শুধু ষষ্ঠ থেকে নবম গ্রেডের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ধাপ সম্পন্ন হলেও দশম থেকে ২০তম গ্রেডের চূড়ান্ত ফল আটকে রাখা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৌখিক পরীক্ষার সময়ে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের ১৬ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পওয়া যায়। তাদের লিখিত পরীক্ষার খাতার সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার সময় নেওয়া হাতের লেখার অমিল চিহ্নিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রার্থীদের ব্রির আনসার ক্যাম্পে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা ভুয়া পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। এ অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও তা না করে আনসার ক্যাম্প থেকেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পুরো বিষয়টির সঙ্গে ব্রির মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠরা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরা পড়ার পর বাকি প্রার্থীদের মধ্য থেকে নিয়োগ চূড়ান্ত করার কথা থাকলে এখন পর্যন্ত তা আটকে রাখা হয়েছে। ভুয়া পরীক্ষার মাধ্যমে মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠদের ইচ্ছেমাফিক লোক নিয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল। মৌখিক পরীক্ষার সময় বিষয়টি ধরা পড়ে যাওয়ায় এখন পুরো ফল আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন একাধিক কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘কোনো পর্যায়ের নিয়োগই আটকে রাখা হয়নি। পর্যায়ক্রমে সব পদেই নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।’

বদলি-পদায়নে স্বেচ্ছাচারিতা
জানা গেছে, ব্রির বিভিন্ন পদে পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে এমন স্বেচ্ছাচারিতা ধারাবাহিকভাবে চলছে। বেশ কয়েকটি বিভাগে শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও তিন বছর ধরে পদোন্নতি বন্ধ রাখা হয়েছে। ডিজির পছন্দের তালিকায় না থাকায় পদোন্নতি ছাড়াই চাকরিজীবন শেষ করতে হচ্ছে অনেক বিজ্ঞানীকে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, ব্রিতে একটি রাইস মিউজিয়াম স্থাপন কর্মসূচির পরিচালক হিসেবে সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার মোহাম্মদ আবদুল মোমিনকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালের ২৭ মে দায়িত্ব দিতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠান মহাপরিচালক শাহজাহান কবীর। মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি অনুমোদনও করা হয়। কিন্তু ওই সময় আবদুল মোমিন উচ্চশিক্ষার জন্য প্রেষণে ছিলেন—যা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে গোপন রাখা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ২৪ জুন কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা-৩ অধিশাখার উপসচিব মো. আবুল বাশার স্বাক্ষরিত চিঠিতে ব্রির ডিজির বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘প্রেষণ ভোগরত কোনো কর্মকর্তাকে কোনো কর্মসূচির পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ফলিত গবেষণা বিভাগের ফজলুল ইসলামকে বিভাগ পরিবর্তন করে প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে খামার বিভাগের প্রধান করা হয়। এ ক্ষেত্রে খামার বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার (এসএসও) ড. মামুনুর রহমান ও রেজাউল মনিরকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। অন্যদিকে পদ না থাকলেও ফজলুল ইসলামকে রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান করা হয়। নিয়োগ বিধি অনুযায়ী সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার পদে নিয়োগে পাঁচ বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। অথচ এনজিও এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে নিয়াজ ফারহাতকে কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিভাগীয় পদ না থাকলেও ড. আনোয়ারুল হক ও ড. তাহমিদ হোসেনকে ডিঙ্গিয়ে অধিকতর জুনিয়র ড. দুররুল হুদাকে পোস্ট হার্ভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ এ বিজ্ঞানীকে গাড়ি মেরামত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে গাড়ি মেরামত খাতে ব্যয় বেড়ে গেছে। গাড়ি মেরামতের নামে মহাপরিচালক শাহজাহান কবীর এবং কমিটির সভাপতি দুররুল হুদা বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অস্বাভাবিক ব্যয় চিহ্নিত করে অডিট বিভাগ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে।

তবে ব্রিতে বদলি ও পদোন্নতিতে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই দাবি করে মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘ডিজি ইচ্ছা করলেই কাউকে বদলি করতে পারে না বা কারও পদোন্নতি দিতে পারে না। এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।’

গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াতপন্থিরা
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ব্রির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে জামায়াতপন্থিদের বসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা জানান, ব্রিতে ১৯টি গবেষণা বিভাগের মধ্যে বর্তমানে ১৫টির প্রধান পদে আছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থিরা। সম্প্রতি জামায়াত-বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে সদর দপ্তরে নিয়ে আসা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রিতে জামায়াতের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত ড. আলমগীর হোসেনকে বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে বদলি করে জিআরএস বিভাগের প্রধান করা হয়েছে। একইভাবে ফলিত গবেষণা বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান মুকুলকে আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে বদলি করে সদর দপ্তরে আনা হয়েছে। পরিচালক (গবেষণা) ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান ব্রির বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের শীর্ষ নেতা। অতীতে বিজ্ঞানী সমিতির নির্বাচনে তিনি বিএনপি-জামায়াত প্যানেল থেকে বর্তমান মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীরের বিরুদ্ধে সভাপতি পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। বর্তমানে এ দুজনের মধ্যে চলছে গভীর সখ্য। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সমন্বয়কারী পদে থাকা ড. মুন্নুজান খানম একসময় ইসলামী ছাত্রী সংস্থার নেত্রী ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিজেই নিজেকে দিয়েছেন কঠোর পরিশ্রমী ভাতা
২০১৮ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, দায়িত্বের অতিরিক্ত ‘কঠোর শ্রমসাধ্য’ কাজের জন্য পঞ্চম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক মূল বেতনের সমপরিমাণ সম্মানীভাতা প্রদানের বিধান করা হয়। এ পরিপত্রের সুযোগ নিয়ে নিজের কাজকে ‘কঠোর শ্রমসাধ্য’ দেখিয়ে ভাতা নিয়েছেন ব্রির ডিজি ড. শাহজাহান কবীর। প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে কাজের মূল্যায়ন করে ভাতা পাওয়ার যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও তিনি নিজেই নিজেকে এ ভাতার জন্য নির্বাচন করেছেন। তিনি ২০১৮ সালে দুবার, ২০১৯ সালে তিনবার, ২০২০ সালে দুবার ‘কঠোর পরিশ্রম’ ভাতা গ্রহণ করেছেন। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কোনো গবেষককে ভাতা না দিয়ে নিজেই নিজেকে ‘কঠোর পরিশ্রমী’ ঘোষণা করা গুরুতর অসদাচরণ এবং নৈতিকস্খলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে ড. শাহজাহান কবীর লবেলাকে জানান, ব্রিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কখনোই নিয়মের বাইরে কোনোরকম আর্থিক সুবিধা নেননি।

গেট নির্মাণে স্বেচ্ছাচারিতা
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রয়াত ভাস্কর মৃণাল হকের তত্ত্বাবধায়নে ২০১৬ সালে ব্রির প্রধান ফটক নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৩০ লাখ টাকা। সে-সময় ড. শাহজাহান কবীর ছিলেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (প্রশাসন)। তিনি তখন মৃণাল হকের পরিবর্তে তার পছন্দের ব্যক্তিকে কাজটি দিতে চেয়েছিলেন। তবে তৎকালীন মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস মৃণাল হককে কাজটি দেন। এতে ড. শাহজাহান কবীর ক্ষুব্ধ হন। ২০১৭ সালে মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর নবনির্মিত ওই ফটকটি ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা করেন তিনি। এরপর কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় নতুন ফটক।

শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে এভাবে সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তা। ব্রিতে নিজের ক্ষমতার দাপট দেখানোর জন্যই রাষ্ট্রের টাকার এমন অপচয় করা হয়েছে বলে ধারণা অনেকের।

তবে মহাপরিচালকের দাবি, আগের গেট ভেঙে নতুন গেট নির্মাণের তথ্য সঠিক নয়। আগের ঠিকাদার পুরো কাজ শেষ না করে চলে যায়। পরে ওই গেট ঠিক রেখেই নতুন ডিজাইন করে ওই কাজ শেষ করা হয়।

বাংলো নির্মাণে অনিয়ম
ব্রির মহাপরিচালকের জন্য একটি ও পরিচালকের জন্য একটি বাংলো রয়েছে। তবে পরিচালকের বাংলো আছে একটি। ড. শাহজাহান কবীর পরিচালক থাকাকালে ওই বাংলোতে থাকতেন। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মহাপরিচালকের বাংলো সংস্কার করা হয়। কিন্তু এটিতে না উঠে পরিচালকের বাংলোকে ‘রাইস হাউস’ নাম দিয়ে সেখানেই বসবাস করেন।

অন্যদিকে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে ভৌত সুবিধা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে পরিচালকের দ্বিতীয় বাংলো নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল। কিন্তু সেই টাকায় মহাপরিচালকের বাংলোটি সম্পূর্ণ ভেঙে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স নির্মাণ করেছেন ড. শাহজাহান কবীর। তিনি মহাপরিচালক হওয়ার পর এখন পর্যন্ত অন্য কোনো পরিচালক তাদের জন্য নির্ধারিত বাংলোতে ওঠার সুযোগ পাননি।

ব্রির বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা গেছে, মহাপরিচালকের সার্বিক কর্মকাণ্ডে অধিকাংশ বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তার মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ। তবে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি। তারা জানান, কর্মপরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় বিজ্ঞানীদের গবেষণাকাজ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই ধান গবেষণার সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2021
ভাষা পরিবর্তন করুন »