নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
মোস্তফা রফিকুল ইসলাম ডিউক এবং তার প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা টেলিকমকে ঘিরে দানা বাঁধছে নানাবিধ দুর্নীতি ও অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ। মোস্তফা রফিকুল ইসলাম ডিউক, ফ্লোরা টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। তার প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা টেলিকম দীর্ঘদিন ধরে জড়িত ছিলো সরকারের বিভিন্ন উচ্চমূল্যের প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে। সম্প্রতি তার এসব প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
তার অধীন বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অনুসন্ধানের তথ্য তুলে ধরা হলো।
ই-পাসপোর্ট প্রকল্প ও রাজনৈতিক প্রভাব:
বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট বাস্তবায়ন প্রকল্প, যা জার্মান কোম্পানি ভ্যারিডোসের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, ফ্লোরা টেলিকমের মাধ্যমে ডিউক জড়িত হন। অভিযোগ রয়েছে, ডিউক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রকল্পে স্থান পান।
সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতি:
ডিউকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প আত্মসাৎ করেছেন। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে ৩.৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ফ্লোরা টেলিকম জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের তহবিল থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ।
অর্থপাচার ও মানিলন্ডারিং:
ডিউকের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ডিউকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের সিইও রিয়াজ ইসলাম এবং পুঁজিবাজার অনিয়মের অন্যতম হোতা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের যোগসাজশে ডুবাইয়ে অবৈধভাবে অনেক অর্থপাচার করেন। দুদকের তদন্তে দেখা যায়, তিনি দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। দুবাইতে তার বিপুল অবৈধ সম্পদ আছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে।
ফ্লোরা টেলিকমের আরও জালিয়াতি:
ফ্লোরা টেলিকম ২০১৮ সালে প্রয়োজনীয় সেবা না দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। অগ্রণী ব্যাংকের একজন উপ-পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে টেমিনস কোম্পানির প্রকৃত অর্থের পরিমাণ গোপন করা হয়। অগ্রণী ব্যাংকের দুর্বল কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহারের আড়ালে মানিলন্ডারিং ও অন্যান্য দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত:
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শনে ফ্লোরা টেলিকমের গাফিলতির প্রমাণও পায়। ব্যাংক ও ফ্লোরা টেলিকমের যোগসাজশে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনা উঠে আসে। অগ্রণী ব্যাংককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে মানিলন্ডারিং ও অন্যান্য দুর্নীতি চালানো হয়েছে।
ডিউকের ব্যক্তিগত জীবনে বিতর্ক:
ফ্লোরা টেলিকমের কর্মচারীদের বেতন আত্মসাৎ এবং অসদাচরণের অভিযোগ। মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ আয়োজন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণের অভিযোগ। বিভিন্ন নারীর জীবন নষ্ট করা এবং সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ। ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাও রয়েছে, যেখানে অর্থের মাধ্যমে ছাড়া পান।
সফটওয়্যার জালিয়াতি ও আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন:
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের বিভিন্ন সফটওয়্যার পাইরেটেড কপি ব্যবহার করে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন করে ডিউক। মাইক্রোসফটের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয় এই ডিউকের জন্য।
ডিউকের অবৈধ কার্যকলাপ:
‘ইয়াবা সুন্দরী নিকিতা’ নামটি বেশ আলোচিত ছিল একসময়। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হোটেল পূর্বাণীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান জয়নালের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস নিকিতা এবং মোস্তফা রফিকুল ইসলাম ডিউককে রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটে অশালীন অবস্থায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করেন। অর্থ কাজে লাগিয়ে পরে ছাড়া পান ডিউক। নিকিতাকে লস এঞ্জেলসে বাড়ি করে দিয়েছে ডিউক। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে ডিজিএফআই তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগের সাথে যোগসাজশে তিনি ছাড়া পান। ডিউকের বর্তমান গার্লফ্রেন্ড তানজিয়া জামান মিথিলা-কে সে অবৈধভাবে মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ বানিয়েছে। ডিউক তাকে বাড়ি-গাড়ি করে দিয়েছে এবং তার মানি লন্ডারিংয়ের অন্যতম সহযোগী এই মিথিলাসহ আরও কিছু সাংবাদিক।
মিডিয়া সংযোগ ও প্রভাব:
ডিউক পেইড সাংবাদিক ভোরের কাগজের মিজানুর রহমান সোহেলের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। মানিলন্ডারিং মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি এই সোহেল এবং সিআইডি তাকে গ্রেফতারও করেছিল। ডিয়ার মাধ্যমে তার দুর্নীতিগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও প্রমাণিত হয়েছে একাধিকবার।
দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত:
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ফ্লোরা টেলিকম এবং ডিউকের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা এবং টেলিটকের ৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দেশের ক্ষতি:
ফ্লোরা টেলিকমের অব্যবস্থাপনা ও জালিয়াতির কারণে বাংলাদেশে সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব পড়েছে। ডিউকের অবৈধ কার্যক্রম দেশের অর্থনীতি এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাকে বিপর্যস্ত করেছে। মোস্তফা রফিকুল ইসলাম ডিউক এবং তার প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা টেলিকমের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ শুধু তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে নয়, বরং দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সুনামেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত