নিজস্ব প্রতিবেদক॥
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য শাহনাজ পারভীনকে ঘিরে অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি, বিদেশে সম্পত্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাদারিপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ বাসবারি এলাকায় তাঁর গ্রামের বাড়ি। একসময় ছিলো সাধারণ টিনের ঘর, কিন্তু বর্তমানে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে পাকা একতলা বিল্ডিং। গ্রামে তিনি কিছুই করেন নি, তবে ঢাকায় রয়েছে সম্পদের পাহাড়। স্থানীয়দের দাবি, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন শাহনাজ পারভীন। এনবিআরে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই তাঁর আর্থিক অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায় বলে তাঁদের বক্তব্য।
প্রথম স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্সের পর দুদকের সাবেক মহাপরিচালক আতিকুর রহমান খানকে বিয়ে করেন শাহনাজ পারভীন, আর সেই সময় থেকেই তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতার বিস্তার ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুদকে স্বামীর উচ্চপদস্থ অবস্থানের কারণে শাহনাজ পারভীন দুদকের অভিযোগ মোকাবিলার একটি “মধ্যস্থতাকারী শক্তি” হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের দাবি, দুদকে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যাতে সামনে না এগোয়, সেই ব্যবস্থা করতে তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং এর বিনিময়ে দেওয়া-নেওয়া হতো মোটা অঙ্কের টাকা। অভিযোগকারীরা বলেন—এই মিউচ্যুয়াল সেটেলমেন্টই ছিল তাঁর বড় অঙ্কের আয়ের উৎস।
অভিযোগ রয়েছে, শাহনাজ পারভীনের সন্তানরা কানাডার টরন্টোতে থাকেন এবং সেখানে তাঁদের নামে স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে, বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থ পাঠানো হয়েছে টরন্টোতে, যার উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশে তাঁর সম্পদের হিসাবও কম নয়—পূর্বাচলে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশ কয়েকটি প্লট, বনানীতে ২,৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, গাড়ি, পূর্বাচলে প্রায় ২০০ শতক জমি সহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আরও সম্পত্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও তার ভাই ফকির সালাহউদ্দিনের নামে মিরপুরে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তার সরকারি বেতনে এমন সম্পদ অর্জন কতটা যৌক্তিক—সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এনবিআরের ভেতরে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করেন যে, শাহনাজ পারভীন এমন এক প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন যেখানে তাঁর এক ফোন, এক সুপারিশ অনেক সময় কর্মকর্তার চাকরি, মামলার অগ্রগতি কিংবা তদন্তের দিক নির্ধারণ করত। অভিযোগকারীরা বলেন, এনবিআরের ভেতরে তিনি এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক “দরবার” চালাতেন, যেখানে কে সমস্যায় পড়বে আর কে নিরাপদে থাকবে—তা নির্ভর করত তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক, যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর। তাঁকে ঘিরে এই অভিযোগগুলো বছর ধরে আলোচনা হলেও তাঁর বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এসব অভিযোগ, বিদেশে তাঁর সম্পদ, টরন্টোতে পাঠানো অর্থের উৎস, বা এনবিআরের ভেতরের এই কথিত মধ্যস্থতাকারী প্রভাব ঠিক কতদূর বিস্তৃত ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগগুলো গুরুতর এবং প্রয়োজন আনুষ্ঠানিক তদন্ত, যেখানে তাঁর সম্পদের উৎস, ব্যাংক লেনদেন, কর নথি, বিদেশে সম্পত্তি এবং দুদকের অভিযোগ মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা—সবকিছুই খতিয়ে দেখা উচিত। তদন্ত ছাড়া এসব অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা নিশ্চিত করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু একটি মানুষের সম্পদ, প্রভাব এবং নেটওয়ার্ক নিয়ে এত অভিযোগ যখন একইসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটা কি একজন মানুষের দুর্নীতির গল্প, নাকি আরও বড় কোনো প্রভাবশালী চক্রের অংশ?
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত