নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। তার নির্দেশনা অনুযায়ী ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হাদিকে গুলি করেন। এ ঘটনায় করা মামলায় ফয়সাল, তাইজুলসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
হাদিকে গুলির ঘটনার ২৫ দিন এবং তাঁর মৃত্যুর ১৯ দিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তদন্ত ও অভিযোগপত্র জমার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো তাড়াহুড়া করা হয়নি।
এদিকে অভিযোগপত্র সম্পর্কে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, সরকার বলেছে একজন ওয়ার্ড কমিশনার নাকি ওসমান হাদিকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণে ফয়সাল করিম মাসুদ খুন করেছে। এটা তো পাগলেও বিশ্বাস করবে না। হাদিকে খুনের সঙ্গে একটা পুরো চক্র জড়িত। এই খুনের পেছনে রাষ্ট্রযন্ত্র জড়িত। তাদের বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত আমাদের এই লড়াই থামবে না। যেই চার্জশিটে তাদের নাম নেই, সেই চার্জশিট মানি না।
হাদি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে গতকাল বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ডিবিপ্রধান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের পরিকল্পনায় ন্যক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। তদন্তে জানা যায়, হাদি নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিগত সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য রেখে আসছিলেন। এর ফলে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়। হাদিকে গুলি করা এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ফয়সাল ও তার প্রধান সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পালাতে সার্বিক সহায়তা করেন তাইজুল ইসলাম চৌধুরী। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নিহতের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এই হত্যাকাণ্ড।
অতিরিক্ত কমিশনার আরও জানান, সার্বিক তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং গ্রেপ্তার আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দি ঘটনাস্থল ও প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, উদ্ধার আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে গ্রেপ্তার ১১ ও পলাতক ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই মামলার বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে বা অন্য কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে, তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
শুটার ফয়সাল, তাকে বহনকারী মোটরসাইকেলের চালক আলমগীর ও পরিকল্পনাকারী তাইজুল ছাড়া অন্য আসামিদের কার কী ভূমিকা ছিল, তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুই আসামিকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে সহায়তা করেন ফিলিপ স্নাল, ফয়সালকে বাসায় আশ্রয় দেন ও অস্ত্র সংরক্ষণ করেন তার ভগ্নিপতি মুক্তি মাহমুদ, বোন জেসমিন আক্তার; হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট পরিবর্তন, অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থানান্তরে যুক্ত ছিলেন ফয়সালের বাবা হুমায়ুন কবির, মা হাসি বেগম; তাকে পালানোর জন্য অর্থ সহায়তা দেন স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, অস্ত্র নরসিংদীতে বহন করে নিয়ে যান সাহেদার বড় ভাই ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন ফয়সাল ও আলমগীরের বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল সরবরাহ করেন ফয়সালের বন্ধু মো. কবির, সীমান্ত পার হতে সহায়তা করেন নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, সিবিয়ন দিও, সঞ্জয় চিসিম, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও সহায়তা করেন তাইজুলের ভগ্নিপতি আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি হেফাজতে রেখেছিলেন মো. ফয়সাল। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিম, আলমগীর, তাইজুল, মুক্তি মাহমুদ, জেসমিন ও ফিলিপ পলাতক।
এদিকে শুটার ফয়সাল সম্প্রতি একাধিক ভিডিও বার্তায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি দুবাইয়ে আছেন এবং র্যাবের এক সদস্য ও এক সোর্স তাকে পালাতে সহায়তা করেন বলেও দাবি তার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফয়সালের ভিডিও আসল বলেই মনে হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনও আসেনি। তবে তিনি দুবাইয়ে থাকার যে দাবি করছেন, সেটি ঠিক নয়।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তকালে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেই অস্ত্র ব্যবহার করেই হাদিকে গুলি ছোড়া হয়। এর আগে ফয়সাল ও আলমগীরকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তাকারী দুজনকে মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গিয়েছিল। সেই তথ্য সঠিক বলে জানায় ডিবি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে কত দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারে, এটি একটি উদাহরণ। তবে তাড়াতাড়ি তদন্ত শেষ করতে গিয়ে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে গেল কিনা, সেই প্রশ্নও থাকতে পারে। হত্যার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অভিযুক্তদের যোগসূত্র পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হলে বিষয়টি মানুষের কাছে স্পষ্ট হবে।
ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন ওসমান হাদি। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরের কালভার্ট রোডে চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় তাঁকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর রাতে পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবি। এর মধ্যে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে হাদির মৃত্যু হয়। এরপর ২০ ডিসেম্বর আগের মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। তদন্ত শেষে গতকাল মামলাটির অভিযোগপত্র দিল পুলিশ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত