জাহিদ হোসেনঃ
ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি–৪ যেন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক অদৃশ্য আতঙ্কের জনপদে। এই আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে এসেছে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর অর্পণা সরকার মৌ ও তার স্বামী, লাইনম্যান সুকাশের নাম। মিটার সংযোগ বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিদ্যুতের তার চুরি এবং অবৈধ সম্পদ গড়ার মতো গুরুতর অভিযোগে এই দম্পতিকে ঘিরে এলাকায় চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।মিটার সংযোগই যেন ‘সোনার খনি’।
একাধিক সূত্রের দাবি, নতুন মিটার সংযোগকে অবৈধ আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত করেছেন অর্পণা সরকার। অফিসে ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের দায়িত্বে থাকলেও তিনি মূল কাজের পরিবর্তে নতুন সংযোগ আদায়ে সক্রিয় থাকেন বলে অভিযোগ। কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, প্রতি মাসে দেওয়া অন্তত ১০০টি নতুন সংযোগের মধ্যে প্রায় ৯০টিই তার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি সংযোগের বিপরীতে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভয়ভীতির কারণে মুখ খুলতে সাহস পান না কর্মচারীরাকেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ–ভাগইর জোনাল অফিসে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অর্পণা ও তার স্বামী সুকাশ প্রকাশ্যেই হুমকি দেন।
তাদের বক্তব্য, ওরা বলে—‘আমাদের হাত অনেক লম্বা, চাকরি খাওয়াতে সময় লাগবে না।’ এই ভয়ে আমরা চুপ করে থাকি।
অভিযোগ রয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনেও লাইনম্যান সুকাশ অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এমনকি এজিএম (কমার্শিয়াল), ওয়্যারিং ইন্সপেক্টর ও জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারদেরও বিআরইবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ভয় দেখানো হয়।
৩৩ কেভি তামার তার চুরির অভিযোগসবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মাওয়া সড়কের ঝিলমিল এলাকায় ৩৩ কেভি লাইনের তামার তার চুরির ঘটনায়। স্থানীয়দের দাবি, চুনকুটিয়া সাবান ফ্যাক্টরি এলাকার একটি ভাঙারির দোকানে তার বিক্রির সময় লাইনম্যান সুকাশ হাতেনাতে ধরা পড়েন। তবে অর্পণার উপস্থিতিতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। বারবার এমন অভিযোগ ওঠার পরও কীভাবে তিনি পার পেয়ে যান তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে আসে অবৈধ সম্পদের চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অর্পণা সরকারের নামে দেশে ও বিদেশে বিপুল সম্পদের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অভিযোগ। ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় জমি, কেরানীগঞ্জে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি, আগানগরের মালু পাড়ায় সাততলা ভবনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এসব সম্পদের অর্থের উৎস নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নীরবতা।
সূত্রের দাবি, অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে অর্পণার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। নতুন শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ সংক্রান্ত গোপন তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।অবাক করার বিষয় হলো, একাধিক গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ প্রকাশিত হলেও অর্পণা ও সুকাশ এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। নতুন জিএম দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে।
পুরো ব্যবস্থাটাই তদন্ত হওয়া দরকার’বিআরইবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, এটা শুধু একজন বা দুইজনের বিষয় নয়। পুরো ব্যবস্থাটাই তদন্তের প্রয়োজন। জিএম থেকে শুরু করে নিচের স্তর পর্যন্ত কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি–৪ এ বর্তমান জিএমের পদায়ন, অতীত কর্মস্থল, বিদেশ ভ্রমণ ও অর্থের উৎসও যাচাই করা প্রয়োজন। একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও দায়িত্বে বহাল থাকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
জনমনের প্রশ্ন? পল্লী বিদ্যুতের মতো একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যদি ভয়ভীতি, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এভাবে চলতে থাকে, তবে সাধারণ গ্রাহক ন্যায়বিচার পাবে কোথায়?
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় কি না—নাকি অর্পণা-সুকাশের আতঙ্কই স্থায়ী রূপ পাবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত