ডেস্ক রিপোর্টঃ
রাজধানীর অধুরে কেরানীগঞ্জে শিক্ষিকার বাসা থেকে নিখোঁজ ছাত্রী ও তার মায়ের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় শিক্ষিকা মীম আক্তার (২৪) ও তার ছোট বোন নুরজাহান ওরফে নুসরাতকে (১৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগে পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয়তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে শিক্ষার্থী জোবাইদা রহমান ফাতেমা (১৪) ও তার মা রোকেয়া রহমানের (৩২) লাশ উদ্ধার করা হয়।
তিন রুমের ওই ফ্ল্যাটে শিক্ষিকা তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। গত ২৫ ডিসেম্বর বিকালে ওই বাসায় প্রাইভেট পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় নবম শ্রেণির ফাতেমা। পরে তার সন্ধানে সেখানে যান মা রোকেয়া। এরপর দুজনই নিখোঁজ হন।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, ওইদিনই ২৫ ডিসেম্বর প্রথমে মেয়েকে, তারপর মাকে হত্যা করে শিক্ষিকা ও তার বোন নুসরাত। এরপর ফ্ল্যাটের একটি রুমের খাটের নিচে মায়ের লাশ এবং বাথরুমের ফল্স ছাদে মেয়ের লাশ লুকিয়ে রাখে। লাশ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত ২২ দিন ধরে তারা ওই ফ্ল্যাটে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। তবে শিক্ষিকার স্বামী জানতেন না যে ঘরের ভেতর লাশ রয়েছে। এই অবস্থায় ৬ জানুয়ারি শিক্ষিকার ৩ বছরের ছেলের জন্মদিন পালন করতে সপরিবারে তারা ফরিদপুরের ভাঙ্গায় যান নানাবাড়িতে। ১০ জানুয়ারি তারা আবার কেরানীগঞ্জে ফিরে আসেন।
শিক্ষিকার স্বামী রঙের ডিলারের ব্যবসা করেন। তিনি ঘরে গন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে স্ত্রী বলতেন, বাইরে কুকুর মারা গেছে, সেখান থেকে গন্ধ আসছে। একপর্যায়ে গন্ধে বিরক্ত হয়ে স্বামী বৃহস্পতিবার ঘর তল্লাশি করতে থাকেন। ফ্ল্যাটটিতে ৩টি রুম রয়েছে। একটি রুমের খাটের নিচে তিনি লাশ দেখতে পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন। এরপর বিষয়টি জানাজানি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।
জানা যায়, এইচএসসি পাশ ওই শিক্ষিকা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি করতেন না। বাসায় প্রাইভেট পড়াতেন।
ওসি আরও জানান, শিক্ষিকার প্রতিবেশী ছিলেন ভিকটিম রোকেয়া। তারা পূর্বপরিচিত। শিক্ষিকা একটি এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা কিস্তি তুলেছিলেন। এই ঋণের জামিনদার (গ্রান্টার) ছিলেন রোকেয়া। কিন্তু সময়মতো কিস্তির টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হন শিক্ষিকা। এনজিও কিস্তির টাকা না পেয়ে জামিনদার রোকেয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এ নিয়ে রোকেয়া ও শিক্ষিকার মধ্যে চরম ঝগড়াঝাঁটি ও বাদানুবাদ হয়। বোনকে গালিগালাজ ও অপমান করায় রোকেয়ার ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় নুসরাত। ঘটনার দিন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ফাতেমা প্রাইভেট পড়তে এলে নুসরাতের সঙ্গে ফাতেমার কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নুসরাত ফাতেমার গলা চেপে ধরে তাকে হত্যা করে। ফাতেমা ছিল হ্যাংলা-পাতলা গড়নের। ফলে নুসরাতের পক্ষে ফাতেমাকে কাবু করা সহজ হয়। ফাতেমাকে হত্যার পর শিক্ষিকার বুদ্ধিতে ফাতেমার জামা খুলে সেগুলো নুসরাত পরে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। বাড়িতে দুটো সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এভাবে তারা সিসিটিভি ক্যামেরা ফাঁকি দিয়েছে। এ কারণে ফাতেমা নিখোঁজের পর সিসিটিভিতে দেখা যায়, পড়া শেষে সে ওই বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে।
ওসি জানান, এর দুই ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রোকেয়াকে শিক্ষিকা ফোন করেন। তার মেয়ে ফাতেমা অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে জানান এবং তাকে নিয়ে যেতে বলেন। ফোন পেয়ে রোকেয়া শিক্ষিকার ফ্ল্যাটে ঢুকলে তাকে পেছন থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচিয়ে ধরে নুসরাত। এ সময় শিক্ষিকা মীম তাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেন। এরপর দুই বোন মিলে গলায় ওড়না প্যাঁচিয়ে শ্বাসরোধে রোকেয়াকে হত্যা করেন। পরে ফাতেমার লাশ বাথরুমের ফল্স ছাদে এবং রোকেয়ার লাশ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন।
এদিকে এ ঘটনার তদন্তে পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। মা-মেয়ে নিখোঁজের পর ২৭ ডিসেম্বর স্ত্রী ও মেয়ের সন্ধানে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় সাধারণ ডায়রি করেন রোকেয়ার স্বামী শাহীন আহমেদ। এতেও কোনো কাজ না হওয়ায় ৬ জানুয়ারি তিনি অপহরণ মামলা করেন। মামলায় তিনি পুরো ঘটনা উল্লেখ করলেও পুলিশ লাশ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত ওই শিক্ষিকার ফ্ল্যাট তল্লাশি করেনি।
শাহীন আহমেদ আইনজীবীর সহকারী মুহুরি। তিনি বলেন, আমি বারবার বলার পরও তারা ওই ফ্ল্যাট তল্লাশি করেনি। এমনকি সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল কললিস্ট বিশ্লেষণ করেনি। তিনি ঘাতকদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন।
ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার দুজনই হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছে। শুক্রবার তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামি নুসরাতের বয়স ১৫ বছর। নাবালিকা। তাকে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত