স্টাফ রিপোর্টার॥
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপন দিয়ে অনলাইনে রমরমা চলছে মাদকের বাণিজ্য। ডার্ক ওয়েব, টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে মাদকের অদৃশ্য বাজার। একটি মেসেজ পাঠালেই, বিকাশ বা নগদ লেনদেনের মাধ্যমে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যায় মাদক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের অ্যালকোহল ও ইয়াবার পর বর্তমানে বাজার দখল করেছে নতুন মাদক ‘এমডিএমবি’। তরুণদের লক্ষ্য করে ভয়ঙ্কর এই মাদক বিক্রি হচ্ছে। ভ্যাপ বা ই-সিগারেটের কার্টিজে কয়েক ফোঁটা মিশিয়ে সেবন করলেই মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমডিএমবি সেবনে নেশা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (এনডিএমসি) এমন একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপকে নিরাপদ বাজার হিসেবে ব্যবহার করছিল।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানান, মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত কৌশল পরিবর্তন করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণ প্রজন্মকে ফাঁদে ফেলা এখন তাদের মূল লক্ষ্য। এই অপরাধ দমনে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় নেশার এই ভয়ঙ্কর আগ্রাসন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দিয়ে থামানো সম্ভব নয়। সামাজিক সচেতনতা, পরিবারের মনিটরিং এবং কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগও অপরিহার্য। তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেশার বিজ্ঞাপন এবং বিক্রির এই প্রবণতা কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত প্রতিরোধ।
এছাড়া তারা আরও উল্লেখ করেছেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অনলাইন বাজারে নজরদারি বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজে ও অনলাইন কমিউনিটিতে মাদক সচেতনতা প্রোগ্রাম চালানো জরুরি।দেশে অনলাইনে মাদকের এই দ্রুত বর্ধমান ব্যবসা এবং নতুন ধরনের মাদক এমডিএমবি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত পদক্ষেপ নিলে আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব হবে। এভাবে ডিজিটাল দুনিয়ায় মাদক বাণিজ্য তরুণদের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তবে সক্রিয় নজরদারি, সামাজিক প্রতিরোধ এবং শিক্ষামূলক প্রচারণার সমন্বয় হলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশে এমডিএমবি (MDMB) বাজার ও প্রভাব:
MDMB (MDMB-CHMICA) হলো একটি সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েড, যা ক্যানাবিস বা মারিজুয়ানার মতো প্রভাব ফেলে। তবে প্রকৃত ক্যানাবিসের তুলনায় এটি অনেক বেশি শক্তিশালী ও বিপজ্জনক। MDMB মূলত রাসায়নিকভাবে তৈরি করা হয় এবং মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলে। মাত্র কয়েক ফোঁটা সেবনেই হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, উদ্বেগ, প্যারানয়েডিয়া, কনভালসন এবং এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশে অবস্থান ও বাজার: শহর ও এলাকা: ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও অন্যান্য বড় শহরে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়। বিক্রয় মাধ্যম: টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ডার্ক ওয়েব এবং অনলাইন বিজ্ঞাপন। পণ্য রূপ: ভ্যাপ কার্টিজ, ই-সিগারেট, তরল ফর্ম বা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি।
টার্গেট গ্রুপ: বিশেষ করে ১৫–৩৫ বছর বয়সী তরুণ প্রজন্ম। বাজারে প্রবেশ ও সম্প্রসারণের কৌশল: অনলাইন বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে স্বচ্ছ নয় এমনভাবে তরুণদের ফাঁদে ফেলা। ছোট লেনদেন (বিকাশ, নগদ) মাধ্যমে দ্রুত ডেলিভারি। অন্যান্য মাদক যেমন ইয়াবা বা অ্যালকোহলের পাশাপাশি “নতুন ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প” হিসেবে প্রচার।
সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব: শারীরিক প্রভাব: দ্রুত হৃদস্পন্দন, উচ্চ রক্তচাপ, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া। মানসিক প্রভাব: উদ্বেগ, আতঙ্ক, হ্যালুসিনেশন, কনভালসন। দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি: স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, মানসিক অসুস্থতা, বা হঠাৎ মৃত্যু। সামাজিক প্রভাব: শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অ্যাডিকশন, পারিবারিক বিভ্রান্তি ও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি।
আইনগত ও সরকারি প্রতিরোধ ব্যবস্থা: মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএমসিএ) নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। অনলাইন চ্যানেলগুলোর উপর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার।
বিশেষ অভিযান: সম্প্রতি ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে সংঘবদ্ধ MDMB চক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা: পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে MDMB-এর ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষা। কমিউনিটি ও যুবকেন্দ্রে সচেতনতা সভা। অনলাইনে তরুণদের জন্য নিরাপদ বিকল্প বিনোদন ও কার্যক্রম। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নেশা নিরাময় ও পরামর্শ কেন্দ্রের বিস্তার। MDMB হলো বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য গোপন, বিপজ্জনক এবং প্রায়শই অদৃশ্য হুমকি। সামাজিক সচেতনতা, আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম এবং পরিবার-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। এমডিএমবি ও অনলাইনে বিক্রি হওয়া অন্যান্য সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত