নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে গত কয়েক বছর ধরে সক্রিয় ছিল একটি সংগঠিত প্রতারণা চক্র। কথিত প্রাচীন সীমানা পিলার ও শতবর্ষী কয়েনের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল এই চক্রের উদ্দেশ্য। দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি প্রকাশিত অনুসন্ধানী সংবাদের গত কয়েকটি পর্বে মূলহোতা আহাদুল ইসলাম দুলাল ওরফে এইচএম দুলাল খান (চান্দু) এবং আব্দুল মনসুর ওরফে ইব্রাহিম মুসার নামে নতুন তথ্য সামনে এসেছে । উক্ত সংবাদ প্রচারের পর অনেক ভোক্তভূগী দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির সাথে যোগাযোগ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন তথ্য দিচ্ছেন। সে সব তথ্যে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, অভিযুক্ত প্রতারকচক্র একাধিক ভুয়া পরিচয় ও নকল নথি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চালিয়ে আসছিল।
সূত্র জানায়, তারা নিজেদের কখনো সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, কখনো প্রত্নতত্ত্ব গবেষক কিংবা আন্তর্জাতিক কালেক্টরের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতেন। ভাষা, আচরণ ও নথি প্রদর্শনের কৌশল এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, অনেক শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানুষও শুরুতেই সন্দেহ না করে তাদের কথায় আস্থা রাখতেন।
চক্রটির কৌশল ছিল ধাপে ধাপে আস্থা তৈরি করা। প্রথমে ছোট অঙ্কের লেনদেন দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হতো। পরে ‘বিদেশি ক্রেতা আসছে’, ‘সরকারি ছাড়পত্র মিলেছে’ কিংবা ‘চূড়ান্ত ডিলের আগে শেষ কিস্তি প্রয়োজন’—এই ধরনের অজুহাতে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হতো। একপর্যায়ে যোগাযোগ সীমিত করে শেষে পুরোপুরি বন্ধ করে দিতেন তারা।
প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার ছিল কথিত প্রাচীন সীমানা পিলার বা বজ্রপাত রোধক পিলার ও প্রাচীন কয়েন। কখনো ব্রিটিশ আমলের সীমান্ত পিলার বা বজ্রপাত রোধক পিলাকে প্রাচীন রাজ্যের নিদর্শন হিসেবে দেখানো হতো। অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, এসবের বেশিরভাগই সাধারণ পাথর বা আধুনিকভাবে কৌশলে তৈরি স্তম্ভ। একইভাবে মুঘল ও সুলতানি আমলের স্বর্ণ–রৌপ্য মুদ্রা দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতেন তারা। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, আধুনিক প্রযুক্তিতে এসব বস্তু সহজেই কৃত্রিমভাবে পুরোনো দেখানো সম্ভব।
এই চক্রের শিকার হয়েছেন নাদের খান, মোঃ শাহ আলম, মামুন খন্দকার, রসনা বেগম, আসলাম চৌধুরী ও মালিক সাহেবসহ আরও অনেকে। নতুন যুক্ত হলেন, পলাশ মাহমুদ, মিলন মুজমদারসহ আরও দুই জন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে পলাশ জানান, আহাদুল ইসলাম দুলাল ওরফে এইচএম দুলাল খান (চান্দু) এবং আব্দুল মনসুর ওরফে ইব্রাহিম মুসা চক্রে বিভিন্ন কৌশলে ৭ কোটি ২০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন এ টাকা হারিয়ে আমি নিঃস্ব।
আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীরা জানান, সামাজিক সম্মান ও পারিবারিক মর্যাদার কারণে অনেকেই প্রতারণার পর অভিযোগ করতে সাহস পাননি। এতে চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং নতুন শিকার তৈরি করতে থাকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি অনুযায়ী, আহাদুল ইসলাম দুলালের বিরুদ্ধে আগেও প্রতারণার মামলা রয়েছে। ২০১২ সালের ৬ নভেম্বর মিরপুর মডেল থানায় দায়ের করা মামলায় (এফআইআর নং–৬) দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৫/৪৬৬/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪০৬/৩৪ ধারায় তাকে অভিযুক্ত করা হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এর আগে ২০০৮ সালের ১০ জুন নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দায়ের করা মামলায় (এফআইআর নং–১১) দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইন থাকলেও সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাব বড় দুর্বলতা। কোন বস্তু বৈধভাবে কেনাবেচা করা যায় আর কোনটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ—এই বিভ্রান্তিই প্রতারকদের সুযোগ করে দেয়।
ভুক্তভোগীরা আশা করছেন, তাদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সতর্ক করবে। দ্রুত লাভের প্রলোভনে না পড়ে যাচাই-বাছাই ও আইনগত নিশ্চিতকরণই এই ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান উপায়—এটাই তাদের বার্তা।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত