নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
কেরানীগঞ্জের চরওয়াশপুর এলাকায় গত ২১ জানুয়ারির একটি তুচ্ছ হাতাহাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১০/১৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে একটি বিতর্কিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কথিত সাংবাদিক পরিচয়ধারী শাফায়াত হোসেন ও কাজী শিব্বির একটি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে ব্যর্থ হয়ে প্রতিশোধমূলকভাবে ‘হামলার নাটক’ সাজিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসানোর অপচেষ্টা চালিয়েছেন।

ঘটনার ৭/৮ দিন পর দায়ের করা মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে আল-আমিন নামের এক ব্যক্তিকে, যিনি বাস্তবে বাদী শাফায়াতকে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে নিজ উদ্যোগে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডেকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
চাঁদা দাবির অভিযোগ ও পূর্ব পরিকল্পনার ইঙ্গিত
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ‘নিউজ বাংলা ৭১’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে শাফায়াত ও কাজী শিব্বির ‘আই গ্যাস’ নামক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট ডিলার এজেন্টকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা জরিমানার হুমকি দেন এবং বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেন।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ২১ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে তারা চরওয়াশপুর এলাকায় তথাকথিত ‘দরকষাকষি’র উদ্দেশ্যে উপস্থিত হন। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে তারা পূর্বপরিচিত আল-আমিনকে হোয়াটসঅ্যাপে কল ও মেসেজের মাধ্যমে ঘটনাস্থলে ডেকে নেন।
২১ জানুয়ারির ঘটনার প্রকৃত বিবরণ
ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর শাফায়াত নিজেই উত্তেজিত হয়ে কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। এতে তার বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে সামান্য আঘাত লাগে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে কাজী শিব্বির ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। বিপরীতে আল-আমিন মানবিক কারণে শাফায়াতকে উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় দেন।
পরবর্তীতে আল-আমিন নিজেই ৯৯৯-এ ফোন করেন এবং হাজারীবাগ থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে এসআই শামীম ঘটনাস্থলে পৌঁছে শাফায়াতকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
প্রশ্ন উঠেছে? যে ব্যক্তি পুলিশকে সহায়তা করলেন, আহতকে হাসপাতালে পাঠালেন, তিনি কীভাবে মামলার প্রধান আসামি হলেন?
পুরোনো জখমকে নতুন আঘাত হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ
মামলার এজাহারে গুরুতর জখমের দাবি করা হলেও স্থানীয়রা ঘটনাটিকে ‘হামলার নাটক’ বলছেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালে ঢাকা উদ্যান এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক ঘটনায় শাফায়াতের বাম হাতের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। সেই পুরোনো এক্স-রে রিপোর্ট ও জখমের ছবি ব্যবহার করে বর্তমান ঘটনার আঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়া একটি পূর্বের মানববন্ধনের তথ্যচিত্র ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর প্রমাণ তৈরির অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাদীর সঙ্গে যোগসাজশে এসআই জব্বার তড়িঘড়ি করে মামলা রেকর্ড করেন। অথচ এজাহারে মূল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত গ্যাস প্রতিষ্ঠানের মালিক বা কর্মচারীদের নাম রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বাদীর অতীত নিয়ে প্রশ্ন?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাফায়াত হোসেন অতীতে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকায় সংঘটিত একটি ব্যাংক ডাকাতি মামলার আসামি হিসেবে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেছেন। একসময় মুচির কাজ করলেও বর্তমানে তিনি কথিত ‘আইপি টিভি’ পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার ও মামলা বাণিজ্যে জড়িত এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
তার বিরুদ্ধে একাধিক বিয়ে, মাদকাসক্তি, আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। গোপালগঞ্জে ৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আড়াল করতেই আল-আমিনকে টার্গেট করা হয়েছে এমন তথ্যও সামনে এসেছে।
গভীর রাতে তল্লাশি ও জনরোষ
মামলা দায়েরের পর এসআই জব্বারের নেতৃত্বে অভিযুক্তদের বাড়িতে গভীর রাতে তল্লাশি চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আল-আমিনের স্ত্রী ও শিশু সন্তানের সামনে ‘মাদক অনুসন্ধান’-এর নামে ঘরে প্রবেশ ও হেনস্তার ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে এলাকাবাসী মানববন্ধন করলে অভিযান বন্ধ হয়।
জনমনে জাগা প্রশ্ন?
৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে সহায়তা করা ব্যক্তি কীভাবে প্রধান আসামি?
সাত দিন পর দায়ের করা মামলায় প্রকৃত ঘটনায় জড়িতদের নাম অনুপস্থিত কেন?
একজন বিতর্কিত অতীতের ব্যক্তির অভিযোগে প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণের যৌক্তিকতা কোথায়?
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ইতোমধ্যে কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা এবং পূর্বের ঘটনার নথিপত্র সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও অভিযোগকারীর গ্রেফতারের দাবিতে এলাকাবাসী হাজারীবাগ থানা ঘেরাও এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত