নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুষ-দুর্নীতি, সরকারের অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ পর্যন্ত দুর্নীতিবাজ কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ফলে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কর্মকর্তাদের সংঘবদ্ধ চক্রটি। এসব কর্মকর্তা সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা হাতিয়ে তারা রাতারাতি বনে গেছেন বনের রাজা। হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক।
জানা যায়, সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা) প্রকল্পে সরকারি নির্দেশনামতে বাগান তৈরি না করে বরাদ্দের দেড় কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বন অধিদপ্তরের একটি চক্রের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা গত এক বছর ধরে বন বিভাগে ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও তদন্ত করেনি বন বিভাগ। এই চক্রের মূলহোতা সাদেকুর রহমানকে বন বিভাগ শাস্তির বদলে সম্প্রতি ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিয়েছে।
শুধু পদোন্নতি নয়, তাকে বন বিভাগের লোভনীয় পোস্টিং খ্যাত কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বন অধিদপ্তরের এসব দুর্নীতি চিহ্নিত করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে নিউজ প্রকাশিত হওয়ার পর বনায়নের নামে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের পাশাপাশি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, গত ২৬ নভেম্বর উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা চিঠি দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলামের কাছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের কুমিরা রেঞ্জে ৭০ ও ১০ হেক্টরের দুটি বাগান সৃজনে ব্যর্থতায় জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণপূর্বক দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামের তালিকা সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষকের মাধ্যমে পত্র প্রাপ্তির ৭ দিনের মধ্য তার দপ্তরে প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করেন।
অথচ পত্র প্রাপ্তির পরেও চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের দপ্তর থেকে উম্মে হাবিবার দপ্তরে চিঠি প্রেরণ করা হয়নি। এর আগে গত ২২ এপ্রিল উম্মে হাবিবা চিঠি দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সুফল প্রকল্পে ২০২৩-২০২৪ আর্থিক বছরে কুমিরা রেঞ্জের কুমিরা বিটে ১৭০ হেক্টর দ্রুত বর্ধনশীল বাগান প্রথম জরিপ হয় গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর। জরিপে ১৭০ হেক্টর বাগানে জীবিত চারাগাছের হার ৬০.২০ শতাংশ।
যেখানে চারা থাকার কথা কমপক্ষে ৮০ শতাংশ। একই রেঞ্জের ১০ হেক্টরের অন্য একটি দ্রুত বর্ধনশীল বাগানে জীবিত চারার হার ৫০.৪০ শতাংশ। বাগানে জীবিত চারাগাছের হার সন্তোষজনক না বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া বাগানে চারাগাছের সংখ্যা শতভাগ নিশ্চিত করে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটকে জানানোর জন্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে জানানো হয়।
সূত্র জানায়, বনের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমের আস্থাভাজন হিসেবে খ্যাত ডেপুটি রেঞ্জার সাদেকুর রহমানসহ বাগানের অর্থ আত্মসাৎকারী তিন কর্মকর্তা। সরকারের দেড় কোটি টাকা লুট করে পেয়েছেন পদোন্নতি। এ বিষয়ে বন দপ্তরে চলছে অস্থিরতা।
কুমিরা রেঞ্জে বাগান তৈরির নামে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সাদেকুর রহমান। উম্মে হাবিবা কৌশল করে নামের তালিকা বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমের মাধ্যমে চেয়েছেন, যাতে অভিযুক্ত সাদেকুর রহমানসহ বাগান তৈরিতে ব্যর্থতায় দায়ী অন্য কর্মকর্তাদের নামের তালিকা চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। এই চক্রটি পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটকে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করেছে এমন প্রচারণা চালানোর খবর পাওয়া গেছে।
কুমিরা রেঞ্জে বনায়নের নামে প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান, উপবন সংরক্ষক (ডিসিএফ) এসএম কায়চার (বর্তমানে পরিচালক) বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ইকোপার্ক চট্টগ্রাম এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জয়নাল আবেদীন, যিনি বর্তমানে সিলেট বন বিভাগের হবিগঞ্জে কর্মরত আছেন।
এ বিষয়ে কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান বলেন, আমি এক বছর দুই মাস হয়েছে এখানে আসছি, আপনি আমার ডিএফওর সঙ্গে একটু কথা বলুন। ডিসিএফ এস.এম কায়চারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি। তবে সিলেট হবিগঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, আমি তো অভিযুক্ত; আমি কিছু বলতে পারব না।
সূত্র জানায়, বনায়নের এই হরিলুটের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বরাদ্দের সব অর্থ উত্তোলনের পর এই তিন কর্মকর্তাকে বদলি করে প্রাইজ পোস্টিং পদোন্নতি দিয়ে এস.এম কায়চারকে চট্টগ্রাম, সাদেকুরকে কক্সবাজার এবং জয়নাল আবেদীনকে সিলেটে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. ম্যোল্লা রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।
উল্লেখ্য, দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা তিন কর্মকর্তা থেকে ঘুষ বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ আছে, তবে তিনি গণমাধ্যমকে তা অস্বীকার করেছেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত