কাগজ-কলমে গভীর নলকূপ স্থাপন ও মান পরীক্ষা হলেও বাস্তবে অস্তিত্বহীন হাজারো স্পট
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিতর্কিত প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগে অধিদপ্তরে অস্থিরতা ও ক্ষোভ
আর্সেনিকমুক্ত পানির দোহাই দিয়ে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি
নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারে অচল অধিকাংশ পানির উৎস, জনমনে তীব্র অসন্তোষ
অফিসার-ঠিকাদার যোগসাজশে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাটের মহোৎসব
মন্ত্রণালয় ও দুদকের নজরদারিতে প্রধান প্রকৌশলীসহ সিন্ডিকেটের রুই-কাতলারা
স্টাফ রিপোর্টার॥
দেশের প্রান্তিক জনপদে সুপেয় ও নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার এখন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সীমাহীন লুটপাটের কারণে চরম হুমকির মুখে পড়েছে। অধিদপ্তরে নতুন প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের পর থেকেই এই সমালোচনা ও অস্থিরতা এক নজিরবিহীন রূপ ধারণ করেছে, কারণ অভিযোগ উঠেছে যে তিনি জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে এবং অন্তত ডজনখানেক যোগ্য কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে এই শীর্ষ পদটি দখল করেছেন। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই দুর্নীতির অসংখ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোয় অধিদপ্তরের ভেতরে যেমন চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে, তেমনি মাঠপর্যায়েও এই অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। নিরাপদ পানি সরবরাহের নামে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে তার সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না এবং বিশেষ করে পানির গুণগত মান পরীক্ষা ও গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই গিলে খাচ্ছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের অন্তত ৫৪টি জেলায় স্থাপিত ল্যাবরেটরিগুলোতে পানির মান পরীক্ষার নামে নজিরবিহীন জালিয়াতি চলছে। আর্সেনিক, আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ও রিএজেন্ট কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকার ভুয়া ভাউচার জমা দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো ল্যাবরেটরি টেস্ট ছাড়াই মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এটি কেবল আর্থিক দুর্নীতি নয়, বরং নিরাপদ পানির সার্টিফিকেট দিয়ে অনিরাপদ পানি পান করানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে এক ভয়ংকর তামাশার শামিল। প্রধান প্রকৌশলীর ছত্রছায়ায় থাকা এই সিন্ডিকেট গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার গভীর নলকূপের পানির মান পরীক্ষার নামগন্ধ না থাকলেও ভুয়া মাস্টার রোলের মাধ্যমে কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে। অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে বসে থাকা একটি বিশেষ বলয় দীর্ঘদিন ধরে একই পদে বহাল থেকে এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের মাধ্যমেই ঠিকাদারদের সাথে অলিখিত কমিশন চুক্তি সম্পন্ন হয় যার ফলে মাঠ পর্যায়ের ল্যাবরেটরি তদারকি ব্যবস্থা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ জেলাগুলোতে মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ পানির উৎস স্থাপনের কয়েক মাস যেতে না যেতেই অচল হয়ে পড়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে অত্যন্ত নিম্নমানের পাইপ ও ফিল্টার ব্যবহার এবং প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে বালু-সিমেন্টের পুকুর চুরির তথ্য উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তারা নিরাপদ পানির জন্য মাসের পর মাস সরকারি দপ্তরে ঘুরেও কোনো সুফল পাচ্ছেন না বরং যারা অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে পারছেন তারাই সরকারি সম্পদ নিজেদের ব্যক্তিগত আঙ্গিনায় কুক্ষিগত করছেন। এমনকি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ প্রকল্পে কয়েক হাজার ট্যাংক বিতরণের কথা থাকলেও সুবিধাভোগীদের ভুয়া তালিকা তৈরি করে সেই ট্যাংকগুলো খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পের কাজেও মাটির গভীরতা ও আয়তন ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে বাড়িয়ে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে যা বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর মেয়াদে আরও ত্বরান্বিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের বিতর্ক এবং বিভিন্ন প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি জালিয়াতি খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের একাধিক তদন্ত কমিটি কাজ করছে এবং দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কোনো কার্পণ্য করা হবে না। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীসহ অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নামে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং প্রকল্প থেকে অবৈধ কমিশন নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারিসহ আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে বসানোর কারণেই অধিদপ্তরে জবাবদিহিতা ভেঙে পড়েছে এবং নিরাপদ পানির প্রকল্পগুলো এখন মুষ্টিমেয় কয়েকজনের লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে জিপিএস লোকেশন ভিত্তিক ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং স্বতন্ত্র থার্ড পার্টি অডিট চালু করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় নিরাপদ পানির এই বিশাল বাজেট কেবল সিন্ডিকেটের পকেটেই যাবে আর দেশের মানুষ বিশুদ্ধ পানির মৌলিক অধিকার থেকে আজীবন বঞ্চিত থেকে যাবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত