স্টাফ রিপোর্টার॥
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী রেলওয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা ফকির মো. মহিউদ্দীন এখন আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছেন। শুধু তাই নয়, খোলস পাল্টে তিনি এখন হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ফোরামের নেতা। সাবেক দুই রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও নুরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে তার সখ্য ছিল। সেই সুবাদে তিনি রেলওয়ের লাভজনক পদে নিয়োগ পান। সাবেক দুই মন্ত্রীর প্রভাবে তিনি ছিলেন রেলের খালাসি নিয়োগ কমিটির প্রভাবশালী সদস্য। ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির আশীর্বাদপুষ্ট। বিগত সরকারের সময়ে তিনি ছিলেন ২০ লোকোমোটিভ ও ১৫০ মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পের পরিচালকও।
৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরই ভোল পাল্টে ফকির মো. মহিউদ্দীন গঠন করেন রেলের বৈষম্যবিরোধী ফোরাম। রাতারাতি হয়ে যান এই ফোরামের মুখ্য সমন্বয়ক। সরকার পরিবর্তনের পর ‘খোলস পাল্টে’ পদোন্নতির মাধ্যমে রেলের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) হন। বিগত সরকারের সময়ে ‘বৈষম্যের শিকার’, এমন মিথ্যা প্রচার চালিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই চতুর্থ গ্রেড থেকে তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন রেলের ২০তম বিসিএস (তৃতীয় গ্রেড) ব্যাচের কর্মকর্তা ফকির মহিউদ্দিন। শুধু তা-ই নয়, পদোন্নতি পেয়েই তিনি তার অনিয়ম-দুর্নীতি ও অপকর্ম বাড়িয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে দুই মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির আশীর্বাদে কেনাকাটায় অনিয়ম, বদলি বাণিজ্য, মালপত্র না কিনে বিল পরিশোধ, ঠিকাদারের পরিবর্তে নিজেই ব্যবসা করেছেন ফকির মো. মহিউদ্দীন। রেলে কেনাকাটায় ‘ভ্যারিয়েশন’ পদ্ধতি প্রয়োগ করে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং কোটি টাকা ব্যয়ে অপ্রয়োজনীয় ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন করার অভিযোগ এসেছে মহিউদ্দীনের নামে। এছাড়া অনুমোদনহীন এয়ার ব্রেক কেনার নামে তিনি প্রায় অর্ধ কোটি টাকা লোপাট করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফকির মো. মহিউদ্দীনের নামে এসব অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা হয়েছে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে অনুসন্ধানে নেমেছেন দুদক কর্মকর্তারা।
অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই কয়েকজন ছাত্র সমন্বয়ককে ভুল বুঝিয়ে রেলওয়ের প্রধান ভবনে শোডাউন করেন ফকির মহিউদ্দিন। এ ঘটনার কিছুদিন আগেই বিগত সরকারের সময়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) নির্বাচনে সভাপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেওয়ার সেই ছবি এখনো বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে।
সম্প্রতি রেলের বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্ত প্রকল্প নিরীক্ষা অধিদপ্তরের এক অডিট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) মাধ্যমে রেলের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে ২০টি লোকোমোটিভ ও ১৫০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে প্রকল্পের বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে একই প্রকল্পের আওতায় অতিরিক্ত ৩৭টি কোচ সংগ্রহ করে সরকার। এই ৩৭টি কোচ কেনার ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ না করে প্রকল্পের সমুদয় টাকা চরম অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে।
বিদেশ থেকে মালপত্র বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকারি আদেশে সুনির্দিষ্টভাবে ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে নিজে লাভবান হওয়ার জন্য ফকির মহিউদ্দীন অতিরিক্ত ৩৭টি কোচ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্দেশনা অমান্য করেন। চুক্তিতে ৩৭টি কোচের এয়ার ব্রেকের জন্য উন্নতমানের যন্ত্রাংশ জার্মানি থেকে আমদানি ও ফিটিংসের কথা বলা হলেও অবৈধ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তিনি হাঙ্গেরি থেকে নিম্নমানের এয়ার ব্রেকের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করেছেন।
বিগত সরকারের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির প্ররোচনায় ট্রেন ধোয়ার জন্য ঢাকা ও রাজশাহীতে দুটি ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এই অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় করা হয় প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। প্রকল্প পরিচালক মো. হারুন-অর-রশিদ চাকরি থেকে অবসরে গেলে রেলমন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির প্রভাবে এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদে নিয়োগ বাগিয়ে নেন মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) ফকির মো. মহিউদ্দীন। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও রাজশাহীতে দুটি ট্রেন (রেল) ওয়াশিং মেশিন স্থাপন করা হয়। অভিযোগ আছে, এই মেশিন কেনা ও সরবরাহের জন্য নির্বাচন করা হয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি ফজলে করিম চৌধুরীর আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানকে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের আওতায় অধিক দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে চুক্তিতে না থাকলেও ভ্যারিয়েশনের নামে লোপাট করেছেন অতিরিক্ত ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মূল চুক্তিপত্রের ‘বিশেষ শর্ত’ অংশের ক্লজ নম্বর (জিসিসি ১৫.২)-তে উল্লেখ আছে, ‘মূল্য সমন্বয় প্রযোজ্য হবে না’। একই চুক্তিপত্রের চুক্তির সাধারণ শর্ত অংশের ক্লজ নম্বর, জিওসি ১৫.২-তে বলা হয়েছে, চুক্তির অধীনে সরবরাহ করা পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবার জন্য সরবরাহকারীর দেওয়া দরের উল্লিখিত মূল্য থেকে ভিন্ন হবে না। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই।
এ ছাড়া মূল দরপত্র দলিলে বিডিং ফর্মের নোট ১-এ উল্লেখ আছে, মূল্য উদ্ধৃতি স্থির হবে। অভিযোগ আছে, এর পরও চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে দরপত্রে উদ্বৃত্ত মূল্যের চেয়ে শতকরা ২২ দশমিক ৭৭ ভাগ বেশি উল্লেখ করে বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ) দাখিল করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মো. হারুন-অর-রশিদ তার নোটে লেখেন, ‘এই ভ্যারিয়েশন প্রস্তাবের (বিল) মাধ্যমে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই।’ তবে অভিযোগে জানা গেছে, পরবর্তী সময়ে প্রতারণা ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে অতিরিক্ত ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় মন্ত্রী, সংসদীয় কমিটির সভাপতির সিন্ডিকেটকে লুটপাটে সহযোগিতা করেন ফকির মো. মহিউদ্দীন।
ইতোমধ্যে অবশ্য রেলপথ মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনা তদন্তে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. জিয়াউল হককে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু কমিটি গঠন নিয়েই এবার অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত ফকির মো. মহিউদ্দীনকে সুবিধা দিতেই তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলসচিব জানান, এ বিষয়ে কাজ চলছে। কমিটি কবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘ওখানে বিস্তারিত কিছু বলা নেই। তবে তারা কাজ করছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিং প্ল্যান্ট পরিদর্শনের জন্য তদন্ত কমিটি রাজশাহীতে যাবে।
জানা গেছে ফকির মো. মহিউদ্দীন ২০০১ সালের মে মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী যন্ত্র-প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। ২৫ বছরের কর্মজীবনে অর্ধেক সময় অর্থাৎ গত সরকারের আমলে প্রায় ১২ বছর যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের সবচেয়ে লাভজনক পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময় তিনি সৈয়দপুরে সহকারী কর্মব্যবস্থাপক (নির্মাণ); বিভাগীয় যন্ত্র প্রকৌশলী (লোকো) পাকশী, লালমনিরহাট ও চট্টগ্রাম; কর্ম ব্যবস্থাপক (নির্মাণ) পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম; বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (কারখানা) পাহারতলী, চট্টগ্রাম; প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) ও প্রকল্প পরিচালক, রেলভবন; প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্ব) চট্টগ্রাম; প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) ও প্রকল্প পরিচালক, রেলভবন ও যুগ্ম মহাপরিচালক পদের মতো লাভজনক পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এই পদগুলো মেকানিক্যাল বিভাগের সবচেয়ে লাভজনক পদ। এই পদের মাধ্যমে মেকানিক্যাল বিভাগের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, সরবরাহ, ইঞ্জিন মেরামত, যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ দরপত্র ও অন্য ব্যয় নির্বাহের অর্থ বরাদ্দ, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি বা পদায়ন ও প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) এবং ২০ লোকোমোটিভ ও ১৫০ মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পের পরিচালক ফকির মো. মহিউদ্দীন খালাসি নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, এটা একেবারেই মিথ্যা অভিযোগ এবং একটি অপপ্রচার। ভ্যারিয়েশনের নামে অর্থ লোপাট অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়ে এই মহাব্যবস্থাপক বলেন, এ প্রকল্পের প্রথম প্রকল্প পরিচালক হারুন-অর-রশিদ। উনি ভ্যারিয়েশন করার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং তিনি সংশোধিত (রিভাইস) নকশা অনুযায়ী কাজটি করিয়েছেন। এতে নকশার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের অন্য আনুষঙ্গিক বিষয় যুক্ত করেছেন। পরবর্তী সময়ে ভ্যারিয়েশন সংক্রান্ত সরকারের নিয়ম-নীতিমালার আওতায় এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই করা হয়েছে। তা ছাড়া ভ্যারিয়েশনের টাকা দেওয়ার একক কোনো ক্ষমতা প্রকল্প পরিচালকের নেই। এসব প্রক্রিয়া যথাযথ নিয়ম-নীতি অনুসরণ করেই করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ অনুসরণ না করে অর্থ নয়ছয় করার অভিযোগ প্রসঙ্গে ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, যেসব বগির মালপত্র সম্পর্কে অভিযোগ করা হয়েছে, সেই ৩৫টি বগি তো এখনো দেশেই আসেনি। তা হলে এখানে অর্থ নয়ছয় করা হয়েছে কীভাবে। এই অভিযোগও সত্য নয় বলে দাবি করেন প্রকল্প পরিচালক।
ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থক কোনো কালেই ছিলেন না এমন দাবি করে ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, প্রয়োজনে আমার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।
লাভজনক পদে পদায়ন নেওয়ার অভিযোগে প্রসঙ্গে রেলের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকার আমাকে যোগ্য মনে করে নিয়োগ দিয়েছে। আমি শুধু আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত