মোঃ গোলাম ফারুক মজনুঃ
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়; এটি একটি দেশের ক্রীড়া-পরিকল্পনা, সাংগঠনিক দক্ষতা, প্রতিভা বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি ভিশনেরও প্রতিচ্ছবি। বিশ্বকাপের মঞ্চে ছোট-বড় নানা দেশের অংশগ্রহণ প্রায়ই আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, কীভাবে একটি ছোট দেশও বড় স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, আর বিশাল জনসংখ্যার দেশগুলো পিছিয়ে পড়ে।
সম্প্রতি ফুটবল বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় এসেছে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও (Curaçao)। মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটির জনসংখ্যা আনুমানিক দেড় লাখের কাছাকাছি। অথচ এই ছোট দেশটিই বিশ্বকাপের মতো বৃহৎ আসরে জায়গা করে নিয়ে শক্তিশালী জার্মানির বিপক্ষে গোল করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। স্কোরলাইন বড় হতে পারে, কিন্তু গোল করার সাহস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের তুলে ধরার সক্ষমতা, এসবই একটি দেশের ফুটবল উন্নয়নের প্রতিফলন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ, যার আয়তন প্রায় ১,৪৭,৬১০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ২০ কোটিরও বেশি, এখনও বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রশ্ন জাগে- এত বিশাল জনসংখ্যার দেশ হয়েও আমরা কেন বিশ্বমানের ১১ জন ফুটবলার তৈরি করতে পারছি না? প্রথমত, আমাদের ফুটবল কাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী ও পরিকল্পিত নয়। তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক একাডেমি, আন্তর্জাতিক মানের কোচিং এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক লীগ, এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ফুটবল শুধু প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না; এটি গড়ে ওঠে ধারাবাহিক পরিচর্যা, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং সুশাসনের মাধ্যমে।
দ্বিতীয়ত, ছোট দেশগুলো এখন তাদের প্রবাসী খেলোয়াড়দের প্রতিভা কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। কুরাসাওয়ের অনেক খেলোয়াড় ইউরোপের উন্নত ফুটবল ব্যবস্থায় বেড়ে উঠেছে। তারা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে দেশের ফুটবলে যুক্ত করেছে। ফলে সীমিত সম্পদ নিয়েও দেশটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই, গ্রাম থেকে শহর, অলিগলি থেকে মাঠ, প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ ফুটবলের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিবেশ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক সময় ফুটবল নিয়ে আমাদের আলোচনা মাঠকেন্দ্রিক না হয়ে প্রশাসনিক বিতর্ককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। বাফুফের সভাপতি কে, সাধারণ সম্পাদক কে, কে কার সমর্থক, এসব বিতর্কই যেন বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই ফুটবল উন্নয়ন চাই, নাকি আলোচনা ও বিভক্তির মধ্যেই আটকে আছি? ফুটবল উন্নয়ন হয় মাঠে, একাডেমিতে, কোচিং ব্যবস্থায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়; শুধু পদ-পদবি বা আলোচনায় নয়। একদিকে দেড় লাখ মানুষের একটি দেশ বিশ্বকাপে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়, অন্যদিকে ২০ কোটির দেশ এখনো বিশ্বমানের ১১ জন খেলোয়াড় খুঁজে ফেরে, এ বাস্তবতা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য আত্মসমালোচনার জায়গা তৈরি করে। বাংলাদেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই প্রয়োজন, দূরদর্শী পরিকল্পনা, তৃণমূল উন্নয়ন, আধুনিক প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা এবং রাজনীতিমুক্ত পেশাদার ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় ফুটবলপ্রেমী জাতি হয়েও বিশ্বকাপের মঞ্চ আমাদের কাছে কেবল দর্শক হয়ে থাকার আক্ষেপই হয়ে থাকবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত