ডেস্ক রিপোর্টঃ
চিকিৎসকের চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে অনেক রোগীর মনে একটাই প্রশ্ন জাগে, এত পরীক্ষার কী দরকার? কেউ কেউ ভাবেন, ডাক্তার আসলে রোগ শনাক্ত করতে পারেননি, তাই পরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছেন। আবার কারও সন্দেহ, এর পেছনে নাকি আর্থিক স্বার্থ লুকিয়ে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সত্যিটা একদম অন্য রকম।
একসময় ডাক্তারি নির্ভর করত শুধু রোগীর কথায় আর শারীরিক লক্ষণে রোগী কী বলছে, চিকিৎসক কী দেখছেন আর শুনছেন। এই পদ্ধতিতে ভুল রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অকালমৃত্যুর হার ছিল ভয়াবহ। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পরীক্ষাগারনির্ভর চিকিৎসার যাত্রা এবং বিংশ শতাব্দীতে ইমেজিং প্রযুক্তির বিস্ফোরণ চিকিৎসায় এনে দিল এক নীরব বিপ্লব। আজ রক্তের অণুপরীক্ষা, জৈব রাসায়নিক বিশ্লেষণ, জেনেটিক স্ক্রিনিং, সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা বায়োমার্কার ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা আদৌ কল্পনা করা যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বহুল প্রচলিত উক্তি: উপসর্গ clues দেয়, কিন্তু পরীক্ষা দেয় প্রমাণ। যেমন বুকব্যথা হতে পারে গ্যাস্ট্রিকের কারণেই, আবার তা হৃদরোগের ইঙ্গিতও হতে পারে। জ্বর ভাইরাসঘটিত সংক্রমণেও আসতে পারে, আবার ক্যান্সার, অটোইমিউন রোগ বা প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনেও। তাই শুধু উপসর্গ দেখে সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো চিকিৎসাশাস্ত্র সম্মত নয়। এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার নাম ডায়াগনস্টিক রিজনিং। একজন দক্ষ চিকিৎসক প্রথমে রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার ভিত্তিতে সম্ভাব্য রোগগুলোর একটি তালিকা তৈরি করেন। তারপর পরীক্ষার মাধ্যমে সেগুলো যাচাই করেন কোনটা সত্যি, কোনটা নয়। পরীক্ষা কখনো রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়, বরং রোগ শনাক্তকরণকে নিশ্চিত, নির্ভুল ও নিরাপদ করার বিজ্ঞানভিত্তিক হাতিয়ার।
শুধু তাই নয়, পরীক্ষা শুধু বর্তমান রোগই ধরে না, বরং ভবিষ্যতের ঝুঁকিও চিহ্নিত করে। রক্তের শর্করা, কোলেস্টেরল, কিডনি-লিভারের এনজাইম, ক্যান্সারের বায়োমার্কার বা হৃদরোগের ঝুঁকি নির্দেশক উপাদান-এসব পরীক্ষা চিকিৎসককে দেখায় রোগের আগামী পথচিত্র। অনেক সময় লক্ষণ প্রকাশের অনেক আগেই পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে বিপদের পূর্বাভাস। বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্যের ইতিহাসও একথাই বলে। গড় আয়ু বেড়েছে, শিশুমৃত্যু কমেছে, হৃদ্রোগ ও সংক্রামক রোগে মৃত্যু হার কমেছে এই সব অর্জনের পেছনে যেমন : ওষুধ, তেমনি যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে নির্ভুল রোগনির্ণয় প্রযুক্তি। অবশ্যই, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কখনো কাম্য নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া বা তা নিয়ে অমূলক সন্দেহ পোষণ রোগীর জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। মনে রাখবেন, চিকিৎসক রোগীর গল্প শোনেন কান দিয়ে, শরীর পরীক্ষা করেন হাত দিয়ে, কিন্তু শরীরের অদৃশ্য সত্য দেখেন পরীক্ষার আলোয়। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চিকিৎসকের অক্ষমতার নয়, বরং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ভুলতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার প্রতীক। ইলনেস অ্যানজাইটি ডিজঅর্ডার (পূর্বের ‘হাইপোকন্ড্রিয়াসিস’) নামে এক মানসিক রোগে ভুক্তভোগী রোগীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে তাদের দেহে কোনো গুরুতর অসুখ আছে বারবার পরীক্ষায় কিছু না পাওয়া গেলও। ফলে তারা একের পর এক চিকিৎসক বদলান, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হন এবং নতুন নতুন পরীক্ষার জন্য চাপ দেন। এই প্রবণতাকে ‘ডক্টর শপিং’ (Doctor Shopping) বলে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত