ইসমাইল মাহমুদ,মৌলভীবাজারঃ
▪️ ‘যারা ইখানে ডিউটি করইন তারা আওয়ার সময় লেইট করলেও যাওয়ার সময় তারা লেইট করইন না,’ ১০-১১টায় আইয়া ২টার আগেই যাইন গিয়া।’: চা শ্রমিক প্রকাশ তাঁতী
চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলার ৭ উপজেলায় ৬৭টি ইউনিয়নের ২ হাজার ১৫টি গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল হলো ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক। বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ সরবরাহ, গর্ভবতী মা ও প্রসূতির স্বাস্থ্যসেবা, নবজাতক ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, সাধারণ রোগের চিকিৎসা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, ইপিআই, সাধারণ রোগ ও জখমের চিকিৎসা, অসংক্রামক রোগ সনাক্তকরণ ও রেফারেল, পুষ্টি শিক্ষাসহ তৃণমূল পর্যায়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপে (পিপিপি) গড়ে ওঠা মৌলভীবাজারের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মধ্যে স্বল্পসংখ্যক কমিউনিটি ক্লিনিকে সীমিত পরিসরে কিছু ওষুধ পাওয়া গেলেও অধিকাংশ ক্লিনিকগুলোতে চলছে ওষুধের জন্য হাহাকার। সেবা বঞ্চিত সাধারণ মানুষ।
জানা যায়, সপ্তাহের শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার এই ছয়দিন কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা রাখা এবং যথাসময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগমন ও প্রস্থানের কথা থাকলেও অনেক কমিউনিটি ক্লিনিকে অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো উপস্থিত তারা হন না এবং ছুটি না নিয়েই বিনা কারনে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকারও অভিযোগ রয়েছে কোন কোন কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মকর্তা-স্টাফদের বিরুদ্ধে। সপ্তাহের ছয় দিনই জেলার প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা নিতে নারী-পুরুষ, শিশু, বয়স্ক রোগীরা ভিড় করলেও অনেক ক্ষেত্রে ওষুধসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পেয়ে রোগীরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে অধিকাংশ ক্লিনিকে কর্তব্যরত কর্মীরা নিয়মিত বা যথা সময়ে উপস্থিত হন না। এছাড়া দায়িত্ব পালনে অবহেলাতো রয়েছেই। সরকারি নিয়মানুযায়ী কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে বিভিন্ন রোগের জন্য অন্তত ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ ক্লিনিকে সাধারণ সর্দি-জ্বরের ওষুধ ছাড়া কিছুই নেই। এছাড়া ক্লিনিকগুলোতে রয়েছে জনবল সংকটও। ফলে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ মানুষ। মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার সদর, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় রয়েছে সর্বমোট ১৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রতিটি ক্লিনিকে ছুটির দিন ব্যতিত সপ্তাহের বাকি কর্মদিবসে একজন করে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার কথা রয়েছে। এছাড়া একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও একজন পরিবার কল্যাণ সহকারী সপ্তাহে ২দিন সেবা ও পরামর্শ দেওয়ার নিদের্শনা রয়েছে। কিন্তু জেলার অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী পদ শুন্য রয়েছে।
গত কয়েক দিনের জেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ক্লিনিকের তালা খুলা হলেও বন্ধ করা হয় নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের লইয়ারকুল কমিউনিটি ক্লিনিকে বেশ কয়েকবার গিয়ে তার কলাপসিবুল গেইট তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, বৃষ্টির সময় ওই ক্লিনিকের ভেতরে পানি ঢুকে যায়। তাই বৃষ্টির সময় পানিকে তলিয়ে গেছে এই অজুহাতে তারা ক্লিনিক অনেকটা বন্ধ রাখেন। আর শুষ্ক মৌসুমে মাঝে-মধ্যে খোলা হয় ক্লিনিকটি। তবে মাঝেমধ্যে েেখালা থাকলেও ওষুধ পাওয়া যায় না। রবিবার একই উপজেলার কাকিয়াছড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে নির্ধারিত সময়ে গিয়ে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। চা শ্রমিক প্রকাশ তাঁতী বলেন, ‘যারা ইখানে ডিউটি করইন তারা আওয়ার সময় লেইট করলেও যাওয়ার সময় তারা লেইট করইন না। ১০-১১টায় আইয়া ২টার আগেই যাইন গিয়া।
এর আগে গত মঙ্গলবার বেলা সোয়া ২টার দিকে রাজনগর উপজেলার ৬ নম্বর টেংরা ইউনিয়নের সালন কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে সেটিও নির্ধারিত সময়ের আগেই তালাব্দ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানান, ২টার আগেই তারা বন্ধ করে চলে গেছেন। একই চিত্র পাওয়া গেছে উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের অন্তেহরী কমিউনিটি ক্লিনিকেও। গত বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় কমলগঞ্জ উপজেলার মধ্যভাগ কমিউনিটি কিøনিকে গিয়ে তা বন্ধ পাওয়া যায়। ভুক্তভোগীরা জানান, জেলার ২ হাজার ১৫টি গ্রামের কয়েক লক্ষ নিন্ম আয়ের মানুষ পুরোপুরি কমিউনিটি ক্লিনিকের উপর নির্ভরশীল। এসব প্রান্তিক মানুষের অধিকাংশই ইচ্ছে করলেই যখন-তখন উপজেলা-জেলা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ সম্ভব হয় না। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের রুটিন চেকআপ করতে হয় নিয়মিত। কিন্তু জেলার অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকের অব্যবস্থাপনা, ওষুধ না থাকা, জনবল সংকট ইত্যাদি কারনে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।\
রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের গ্রাম অন্তেহরির বাসিন্দা অমিত পাল বলেন, ‘আমাদের গ্রামটি এমনিতেই বছরে কমবেশি ৭ মাস জলের নিচে তলিয়ে থাকে। এ কারনে আমাদের গ্রামটি জলারগ্রাম হিসেবে সারাদেশে পরিচিত। যখন গ্রামের চারপাশে জল থাকে তখন শহরের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হলো নৌকা। শহর থেকে ১৪-১৫ কিলোমিটার দুরবর্তী আমাদের গ্রামে একসময় যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হয়ে অনেকেই অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। পরবর্তীতে গ্রামটিতে কমিউনিটি ক্লিনিক হবার পর আমরা খুবই খুশি হয়েছিলাম। প্রথম প্রথম খুবই ভালো সেবা পেয়েছি। কিন্তু দিন দিন আমরা বঞ্চনার দিকে ধাবিত হচ্ছি। আমাদের ক্লিনিকটি প্রায়ই বন্ধ রাখা হয় বা যথাসময়ে খোলে না। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছি না আমরা। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন আমাদের গ্রামের হাজারো মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় স্থাপিত কমিউনিটি ক্লিনিকটির প্রতি যেন নজর দেওয়া হয়।
একই উপজেলার নিদনপুর গ্রামের গৃহবধু ফাতিহা বেগম বলেন, ‘আমি আলসার রোগে ভুগছি অনেক দিন ধরে। তবে টাকা-পয়সার অভাবে চিকিৎসা করাতে ও ওষুধ কিনতে পারছি না। আগে আমি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে প্রতি মাসে চিকিবৎসা করিয়ে ওষুধ নিতে পারতাম। গত কয়েক মাস ধরে আর ওষুধ পাই না। বড় কষ্টে আছি। হয়তো ওষুধ না খেয়েই মারা যেতে হবে।’
মৌলভীবাজার সদর শ্যামেরকোনা কমিনিউটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) জান্নাত আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকে বর্তমানে ওষুধের সংকট চলছে। রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে অনেক সময় ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর জেনারেল হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে রোগীদের সময় ক্ষেপন হচ্ছে ও আর্থিক ব্যয় বাড়ছে। অনেক সময় রোগীরা ওষুধ না পেয়ে আমাদের সাথেও খারাপ আচরণ করছেন। উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করেছি।
কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) অ্যাসোসিয়েশন মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি মো. রুবেল আহমেদ বলেন, ‘জেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই ওষুধের সংকট চলমান। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে অনেকবার উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে মৌখিক ও লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছি। ওষুধ না পেয়ে রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ব্যাপারে আমাদের জেলার উর্ধতন কর্মকর্তারা ঢাকায় যোগাযোগও করেছেন। আশা করছি দ্রæত ওষুুধ সংকট দুর হবে। মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, কোন কমিউনিটি ক্লিনিকে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা হলে বা কোন কর্মী অবহেলা করলে আমরা খোঁজ নিয়ে তদন্তক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আর কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সরাসরি আমাদের অধীনে নয়। কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। ক্লিনিকের বাজেটগুলো কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) মাধ্যমে দেওয়া হয়। এজন্য আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে কিছুটা বেগ পাচ্ছি। ওষুধ সংকটের কারনে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তির বিষয়ে আমরা আমাদের পক্ষ থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাদের আশ্বস্থ্য করেছেন দ্রæত ওষুধ সরবরাহের বিষয়ে। আশা করছি দ্রæত সংকটের নিরসন হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত