স্টাফ রিপোর্টার:
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের 'চেইনম্যান' পদে কর্মরত মোঃ ইব্রাহীম খলিলের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ জমা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ, ঘুষ-বাণিজ্য এবং দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। জমি দখল, ভুয়া দলিল তৈরিসহ সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়, মোঃ ইব্রাহীম খলিল কোনো স্কুল বা আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেননি। তবুও তিনি কেরানীগঞ্জের আটি পাঁচদোনা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ভুয়া সনদ জমা দিয়ে 'চেইনম্যান' পদে চাকরি নেন। তার মামা জাকির হোসেন, যিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন অস্থায়ী ড্রাইভার ছিলেন, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে এই চাকরির ব্যবস্থা করেন।
মাত্র ছয়-সাত বছর আগেও মোঃ ইব্রাহীম ছিলেন মসজিদের একজন খাদেম। বর্তমানে তিনি কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর এলাকায় 'টিচার্স গার্ডেন সিটি'তে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই ফ্ল্যাট তিনি কিনলেও মালিকানা গোপন করতে নিজেকে ভাড়াটিয়া বলে পরিচয় দেন।
অর্থ ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জানা যায়, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) বছিলা রোড শাখায় তার নামে ৫০ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। IIFC ব্যাংকের আরশীনগর শাখায় তার একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়, তার বেতনের অর্থের প্রয়োজনই হয় না।
সাভার উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে ইব্রাহীম জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে ঘুষ নিতেন। নামজারির কাজ করিয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতেন। ভুয়া দলিল তৈরির মাধ্যমে অন্যদের জমি নিজেদের নামে করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ কাজে তার প্রধান সহযোগী ছিলেন ভূমি অফিসের কর্মচারী সাগর। একপর্যায়ে দুর্নীতির কারণে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এইচ. এম. সালাউদ্দীন মঞ্জু সাগরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। পরে ইব্রাহীম ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের 'এলএ শাখায়' বদলি হন।
কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর ও শান্তিনগর এলাকায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার নামে প্রতিটি বাড়ি থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছিলেন ইব্রাহীম। অভিযোগে বলা হয়, তিনি এলাকাবাসীর কাছ থেকে প্রায় কয়েক কোটি টাকা তুলেছিলেন।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এক মাসের জন্য অবৈধ সংযোগ চালু করেন। পরবর্তীতে সংযোগ কেটে দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এখনো ওই এলাকায় মাটির নিচে অবৈধ গ্যাস সংযোগের পাইপ রয়েছে, যা তদন্ত করলে সহজেই প্রমাণ মিলবে।
ইব্রাহীম খলিল নিজ এলাকায় 'ইব্রাহীম ল্যান্ড মিডিয়া' নামে একটি অফিস খুলেছেন। সেখানে জমি কেনাবেচা, দলিল তৈরি, নামজারি এবং জমি-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি, ১৯৭৯-এর ১৭ নম্বর বিধি অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরা ব্যবসা করতে পারেন না।
অভিযোগে বলা হয়, অফিসে ভুয়া ইউপি চেয়ারম্যানের সনদ, ওয়ারিশান সনদসহ জমি-সংক্রান্ত ভুয়া কাগজপত্র সংরক্ষণ করা হয়। অনুসন্ধান চালালে এসব জাল কাগজপত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
ঘাটারচর মৌজায় ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধিগ্রহণ করা ১৭.৯৩ একর জমির ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল ইব্রাহীম খলিলের ওপর। অভিযোগে বলা হয়, জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পেতে হয়রানি করে তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ নেন।
এমনকি যেসব মালিকের জমির নথিপত্রে সমস্যা ছিল, সেগুলো ঠিক করার নামে অর্থ আদায় করেন। ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে এক জমির মালিকের সঙ্গে মোবাইলে অর্থ লেনদেন নিয়ে তার আলাপ হয়। অভিযোগে উল্লিখিত তার মোবাইল নম্বর ০১৮৩২-৫৩৬৮০৯। কল ট্র্যাকিং করলে এই লেনদেনের সত্যতা উদঘাটন সম্ভব বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
ইব্রাহীম খলিল স্থানীয় কিছু সাধারণ মানুষের সঙ্গে সমবায় সমিতি গঠন করেন। সমিতির সঞ্চিত অর্থ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা থাকলেও ইব্রাহীম ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রায় ৩০-৩৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।
পরবর্তীতে এলাকাবাসীর চাপের মুখে কিছু টাকা ফেরত দিলেও এখনো অনেক সদস্য তাদের অর্থ ফেরত পাননি। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।
একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর আয়ে এত সম্পদ অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগকারীরা বলেছেন, মোঃ ইব্রাহীম খলিল তার অবৈধ অর্থে মসজিদের পুনর্নির্মাণে ১ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। বিভিন্ন ক্লাব ও সংস্থায় মোটা অঙ্কের অর্থ দান করে স্থানীয়ভাবে 'সমাজসেবক' হিসেবে পরিচিতি পান। এতে এলাকাবাসীর কাছে তার জনপ্রিয়তা বাড়লেও তার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, ইব্রাহীম খলিলের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল কললিস্ট, সম্পত্তি এবং জমির নথিপত্র যাচাই করলে তার অবৈধ সম্পদের উৎস বের হয়ে আসবে।
তার বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরিতে প্রবেশ, ঘুষ, দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী মোঃ ইব্রাহীম খলিলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার পাশাপাশি তার অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগ সম্পর্কে মোঃ ইব্রাহীম খলিলের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "অভিযোগগুলো গুরুতর। তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।"
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত