মঈন মুরসালিন :
প্রেম, প্রকৃতি ও প্রার্থনার কবি আল মাহমুদের ৯০তম জন্মদিন আজ শুক্রবার (১১ জুলাই)। ১৯৩৬ সালের এ দিনে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার মৌরাইলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
একটি স্মৃতিকথা : কবি আল মাহমুদ ভাইয়ের সাথে দশবছর
আল মাহমুদ ভাইয়ের সাথে পরিচয়টা বিশেষ কোনো আয়োজন করে হয়নি। হঠাৎ করেই আমাদের এক বড় ভাই রাফিক হারিরি বললো, চলো মাহমুদ ভাইয়ের বাসায় যাই। আল মাহমুদ একজন কবি শুধু এতোটুকু পরিচয়ই জানতাম। তখন তার লেখা আমার পাঠ্য ছিল না। আমি পাঠ্য হিসেবে প্রথম পেয়েছি “খড়ের গম্বুজ”, ২০০০ সালে। তারপর আরো আরো অনেক পাঠ্য পেয়েছি।
রাফিক ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন মগবাজারের বেপারী গলিতে, সেখানেই প্রথম দেখা আল মাহমুদ ভাইকে। শান্ত স্নিগ্ধ মুখের অধিকারী আল মাহমুদ এতটা তেজস্বী কবি ও কথাশিল্পী বুঝেছি আরো অনেক পর।
আমাদের বাড়ি মধুবাগ, মগবাজার। পরিচয়ের পর থেকে নিয়মিত কবিকে দেখতে পেলাম। মধুবাগ, মীরবাগ, মগবাজারে পথে ঘাটে হাঁটার সময়।
কবির শক্তি টের পেলাম ২০০০ সালের পর থেকে যখন নিয়মিত যেতে লাগলাম ‘বাংলা সাহিত্য পরিষদের’ সাহিত্য সভায়। সাহিত্য সভায় আল মাহমুদ ভাইকে ১০ বছর নিয়মিত পেয়েছি। সেই সময়টা আমাদের স্বর্ণ সময়। আমি তখন নিয়মিত সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে ছড়া লিখি। সাহিত্য সভায় গরম গরম ছড়া শুনে উনি মুচকি মুচকি হাসতেন। অনুষ্ঠান শেষে পুরস্কার পেতাম তার হাতে।
তাকে যেদিন প্রথম সাহিত্য সভায় পেয়েছিলাম। সেদিন তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিলো- তুমি সাহিত্য করবে কী না আগে পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নাও। নিজেকে প্রশ্ন করো। তুমি যদি লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নাও তবে জেনে রেখো তোমার কপালে দুঃখ আছে। দুঃখকে মাথা পেতে নিতে পারলেই তোমার সাধনা র্সাথক হবে।
আরেক দিনের বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন-সাহিত্য কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। তুমি যদি সাহিত্য র্সাথক হও তবে তুমি পাবে দুই মুদ্রা। আর যদি বিফল হও তবে পাবে এক মুদ্রা, ব্যর্থ লেখকও সমাজে, নিজস্ব পাড়ায় লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পায়, সুতরাং আমি বলছি সাহিত্য থেকে কিছু না কিছু পাবেই। একটি স্মৃতি তুলে ধরছি পাঠকদের উদ্দেশ্যে-
তখন আমি অর্নাসের ছাত্র। আল মাহমুদ ভাই তখন গুলশান-১ এর পোস্ট অফিস গলির নিজ বাড়িতে থাকেন। মাঝে মাঝেই তরুণ বন্ধুরা মিলে যেতাম মাহমুদ ভাইয়ের বাসায়। কবিতা নিয়ে কথা হতো। সাহিত্য নিয়ে কথা হতো। কখনো আমাদের কোনো সাহিত্য সভায় অতিথি হিসেবে নিয়ে আসতাম। বয়সে তরুণ ছাত্র হলেও তাকে সবসময় অল্প হলেও সম্মানী দিতাম। সম্মানী না দিলে কোনো সাক্ষাৎকার উনি র্দীঘ করতেন না। আমরা অনেক মজা পেতাম। কারণ যখন উনি প্রশ্নের উত্তর ছোট ছোট দিতেন তখনই পকেট থেকে টাকার খাম বের করে যখন হাতে দিতাম তারপরই প্রশ্নের উত্তরগুলো র্দীঘ করে দিতেন।
খুব মনে পড়ে রোজা নিয়ে তার সাথে বেশকিছু স্মৃতি আছে। মাহমুদ ভাই তখন নিয়মিত রোজা রাখেন। রোজায় একটি সাহিত্য সভায় ইফতারির পর মাহমুদ ভাই বললেন, চলো নামাজ আদায় করে নেই। তার কথায় আমরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমাদের অনুরোধে মাহমুদ ভাই ইমামতিতে রাজি হলেন। সেই স্মৃতি এখনও চোখে ভাসে। কুরআন তেলাওয়াত খুব সুমধুর না হলেও অন্যরকম আনন্দ নিয়ে কবির পেছনে নামাজ আদায় করলাম। এই সুযোগ আরেকবার পেয়েছিলাম।
কবি আল মাহমুদের অনেক কবিতা অনেকের পছন্দ হলেও আমি বেশ কিছু বইয়ের বেশ ভক্ত। কারণ আমার কাছে সেগুলো বেশি আর্কষণীয় মনে হয়েছে। আমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থগুলো হলো- ‘উড়াল কাব্য’, ‘নদীর ভিতরে নদী’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘সেলাই করা মুখ’ ইত্যাদি। আত্মজীবনীমূলক যে গ্রন্থ দুটি আমাকে বেশি আকর্ষণ করে সেগুলো- ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ আর ‘কবির আত্মবিশ্বাস’।
আমি মূলত আল মাহমুদ ভাইয়ের গদ্যের বেশি ভক্ত। মাহমুদ ভাইয়ের বেশির ভাগ গল্প উপন্যাস আমার পঠিত। তাঁর অসাধারণ কিছু গল্প-উপন্যাস- ডাহুকী, গন্ধবণিক, পানকৌড়ির রক্ত, আগুনের মেয়ে, কাবিলের বোন, নিশিন্দা নারী, পুরুষ সুন্দর, গুহা মানব, পুত্র, মরু মুষিকের উপত্যকা, চেহারার চতুরঙ্গ, তুষের আগুন, মাহবুবার মানচিত্র। এই বইগুলোর প্রতিটি চরিত্র আমার মুখস্ত। আল মাহমুদের কবিতা ও ছোটগল্প নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হলেও উপন্যাস নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন সুশৃক্সখল গবেষণা হয়নি। আল মাহমুদ বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে এমন কিছু বিষয় সংযোজন করেছেন যা সম্পূর্ণ নতুন। তার বিষয় বৈচিত্র্য ও জীবনদর্শন সাহিত্য ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
আল মাহমুদ ভাই প্রেমের ক্ষেত্রে যৌনতাকে উত্তেজক ভাষায় প্রকাশ করলেও সেখানে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার সুফল বর্ণনা করেছেন।
আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়ে গিয়েছেন তার যর্থাথ মূল্যায়ন হতে সময় লাগবে আরো ৫০ বছর। আমরা তখন বেঁচে থাকবো না। তবে আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে ইতিহাসে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন এটাই বিশ্বাস।
স্মৃতিকথা আর দীর্ঘ করবো না। আল মাহমুদের ব্যক্তির নয় তার সাহিত্যের প্রেমিক আমি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত