ডঃ তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান ॥
আজ আমরা এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরের নিভৃত কোণে থাকা সৃজনশীলতার ঝর্ণাধারা শুকিয়ে যেতে বসেছে। এটি কোনো কাল্পনিক উপন্যাসের গল্প নয়, এটি আমাদের চিরচেনা মাতৃভূমি বাংলাদেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক কঠিন বাস্তবতা। ২০১৫ সালে যখন প্রযুক্তির ঢেউ কেবল আমাদের উপকূলে আছড়ে পড়ছিল, আমরা স্বপ্নে বিভোর ছিলাম এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। কিন্তু চ্যাট জিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হঠাৎ আগমন সেই স্বপ্নকে যেন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে।
আমাদের শিক্ষার্থীরা, যাদের চোখে ছিল নতুন কিছু আবিষ্কারের আলো, আজ তারা নিজেদের ব্রেইনকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করেছে। ভাবুন একবার, যে মস্তিষ্ক এই অত্যাশ্চর্য চ্যাট জিপিটি তৈরি করেছে, সেই মস্তিষ্ককেই তারা এখন তুচ্ছ জিনিস ভাবছে! এটি যেন অনেকটা সেই কারিগরের মতো, যে নিজের হাতে তৈরি সুন্দর ভাস্কর্যটির কদর না করে অন্য কারো তৈরি একটি খেলনার দিকে ছুটে চলেছে।
দেশের শিক্ষাবিদদের সম্মিলিত মতামত থেকে উঠে আসা সাউথ এশিয়ান এডুকেশন রিভিউ, ২০২৪ এর পর্যবেক্ষণ বলছে, অতিরিক্ত এআই নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বকীয় সৃজনশীলতা (Uniqueness) প্রায় ২৫% পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আগে একটি অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে একজন শিক্ষার্থীকে রাত জাগতে হতো, বই ঘাঁটতে হতো, নিজের যুক্তি দিয়ে শব্দ সাজাতে হতো; কিন্তু এখন? একটি মাত্র প্রম্পটে সব হাজির।
বাংলাদেশ শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিইআরআই) এর ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, চ্যাট জিপিটি-এর সহায়তায় অ্যাসাইনমেন্ট করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪৮% এর মধ্যে এখন পরীক্ষা ও কুইজেও সহায়তার প্রবণতা বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট, ২০২৪ প্রকাশ করেছে যে এই নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের লেখার মান ও যুক্তিপ্রয়োগের সক্ষমতা প্রায় ৩৫% কমিয়ে দিচ্ছে। তারা জানে না যে, তাদের এই অলসতা কেবল অ্যাসাইনমেন্টের নম্বর কমাবে না, বরং ভবিষ্যতের পেশাগত জীবনেও এক বিরাট শূন্যতা তৈরি করবে।
একটি বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের ৯৫% শিক্ষার্থী এআই-কে কেবল 'কপি-পেস্ট' টুল হিসেবে দেখছে, যা তাদের অনুসন্ধিৎসু মনকে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে।
শিক্ষার আঙিনা পেরিয়ে যখন এই প্রজন্ম কর্মজীবনে পা রাখবে, তখন তারা দেখবে সেখানেও এক কঠিন প্রতিযোগিতা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) এর ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, সাংবাদিকতা, কোডিং এবং কপিরাইটিং-এর মতো ১০টি পেশা চ্যাট জিপিটির কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে, যা বাংলাদেশেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, দক্ষ কোডারদের সমস্যা বিশ্লেষণের সক্ষমতা ২০-৩০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যদি তারা প্রতিনিয়ত এই প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে। কারণ তারা সমস্যার মূল কারণ না খুঁজে, দ্রুত সমাধানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি) এর নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত AI-এর ব্যবহার নিয়ে কোনো শক্তিশালী নীতিমালা বা আইন তৈরি হয়নি। এই নীতিগত শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র অনৈতিক কাজেও লিপ্ত হচ্ছে। ইউরোপিয়ান ডেটা প্রটেকশন বোর্ডের নির্দেশিকা অনুসারে, বিশ্বব্যাপী এই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে গোপনীয়তা অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, যা বাংলাদেশেও তথ্যের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে AI-ভিত্তিক ফিশিং এবং স্ক্যামিং প্রচেষ্টা ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রযুক্তি যেমন আমাদের দ্রুত কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনি আমাদের সামাজিক জীবনে আস্থা ও নৈতিকতার এক বিশাল ফাটল সৃষ্টি করেছে।
আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য পরিসংখ্যানগত চিত্র আমাদের মনে এক গভীর বেদনা তৈরি করতে পারে। এই পরিসংখ্যানগুলি বাংলাদেশের বর্তমান প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক গতি-প্রকৃতির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে:
বছর-মূল চ্যালেঞ্জ/ক্ষেত্র-সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব (শতকরা হার)- ব্যাখ্যা ও বাস্তবিকতা :
২০২৫- শিক্ষা ও চৌর্যবৃত্তি বৃদ্ধি-শিক্ষার্থীদের ৪০% চৌর্যবৃত্তির জন্য এআই ব্যবহার করবে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি নেটওয়ার্ক শিক্ষা পূর্বাভাস বলছে, কার্যকর এআই-শনাক্তকরণ পদ্ধতির অভাবের কারণে অসদুপায় অবলম্বনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে।
২০৩০- কর্মক্ষম জনশক্তির অদক্ষতা- ৩০% কর্মীর মৌলিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা হ্রাস। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর অনুমান অনুযায়ী, AI দ্বারা স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়া কাজে নিযুক্ত কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থতা, যা বেকারত্বের হার বাড়াতে পারে।
২০৩৫- গবেষণা ও উদ্ভাবন স্থবিরতা- উচ্চশিক্ষায় নিজস্ব গবেষণা প্রজেক্টের মান ৫০% হ্রাস।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ফিউচার রিপোর্ট বলছে, শিক্ষার্থীরা কেবল এআই থেকে তথ্য নিয়ে গবেষণা করায় মৌলিক উদ্ভাবন কম হবে।
২০৪০- মানসিক বিকাশ ও নির্ভরশীলতা- ৭০% যুবসমাজ জটিল সিদ্ধান্তের জন্য এআই-এর ওপর অতি-নির্ভরশীল হবে।
ইউনিসেফ (UNICEF) যুব প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষমতা লোপ পাওয়ায় তারা বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়বে।
২০২৫ সালের মধ্যে আমাদের দেশের ৪০% শিক্ষার্থী তাদের একাডেমিক কাজে পুরোপুরি এআই নির্ভর হয়ে পড়তে পারে, যদি না শিক্ষাব্যবস্থায় কঠোরতা আনা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর অনুমান অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% কর্মীর মৌলিক দক্ষতা কমে যেতে পারে, যা দেশের ICT রফতানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ফিউচার রিপোর্ট অনুসারে, ২০৩৫ সালের দিকে উচ্চশিক্ষায় নিজস্ব গবেষণা প্রজেক্টের মান ৫০% কমে যেতে পারে। ইউনিসেফ (UNICEF) যুব প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০৪০ সালে এসে আমাদের ৭০% যুবসমাজ ছোট থেকে বড় সব ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য এই প্রযুক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এই পরিসংখ্যানগুলি কেবল সংখ্যা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হৃদয়ের কান্না।
চ্যাট জিপিটি একটি অস্ত্র হতে পারে, কিন্তু সেই অস্ত্র দিয়ে আমরা কী করব—সেটি আমাদেরই সিদ্ধান্ত। আমরা কি এই অস্ত্র দিয়ে নিজেদের মেধার ভিত্তিমূল কেটে ফেলব, নাকি এটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করব? বাংলাদেশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ অধিদপ্তর (এনটিআরসিএ) এর রিপোর্ট পর্যালোচনা করে জানা যায়, দেশের ৯০% এরও বেশি শিক্ষক এখনও এই বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি। আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে, মেধা তুচ্ছ নয়, বরং এই মেধা দিয়েই তারা বিশ্বকে জয় করতে পারে।
হে তরুণ! তোমার মস্তিষ্কের কোষে যে কোটি কোটি সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, সে তো কোনো যন্ত্রের দাসত্ব করার জন্য নয়! এই মায়াবী আলোকের প্রতিধ্বনি নয়, তোমার নিজের চিন্তার বজ্রনির্ঘোষে পৃথিবী কাঁপাও! যন্ত্রের হাতে তোমার মেধার চাবি তুলে দিও না; জাগো, ওঠো, এবং প্রমাণ করো, মানুষই যন্ত্রের স্রষ্টা—যন্ত্র নয় মানুষের! তোমার মৌলিক চিন্তাই তোমার জন্মগত অধিকার!
লেখক॥
ডঃ তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক।
দাউদ ইব্রাহিম হাসান, ছাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত