মো: মহিব্বুল্লাহঃ
তুরাগের ঢেউ যখন গোধুলির রঙে রূপ বদলায় তখন শুনতে পাই তার কন্ঠে ধ্বণিত হচ্ছে মাটি ও মানুষের গান। তিনি তার অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন সাধারন মানুষের প্রতিচ্ছবি। এই কণ্ঠ ও অভিনয় এখন অনেক কিশোর, তরুণের অনুপ্রেরণা। বলছি তারিকুল আমিন খানের কথা। তিনি মোহাম্মদপুরে বসবাস করলেও শেকড়ের টানও প্রবল—নেত্রকোনার বারহাট্টার ছয়গাঁও গ্রাম, আর বরিশালের হিজলার শান্ত নীরবতা তার রক্তের ভিতর মিশে আছে। দেশপ্রেম, সাহিত্যের প্রতি গভীর টান, মঞ্চের আলো, ক্যামেরার সামনে বহুরূপী চরিত্র এই তরুণ ভাবনায় বিস্তীর্ণ, কর্মে অদম্য এবং প্রতিটি উচ্চারণে উচ্ছ্বসিত দেশমাতৃকার প্রতি অসীম মমতা।
১৯৯০-এর দশকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এক অতি সাধারণ ঘরে জন্ম তারিকুলের। “আমি ধন্য জন্মেছি এই বঙ্গে…”—প্রতিদিনের আবৃত্তিতে তিনি যেন নিজের জন্মের ইতিহাসকে আবার জাগিয়ে তোলেন। অথই নূরুল আমিন ও বেগম নাসিমা আমিনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় তারিকুল আমিন। অথই নূরুল আমিন নিজেও একজন কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক। যিনি কলম ও চিন্তার শক্তিকে হাতিয়ার করে এ প্রজন্মকে দিক দেখাচ্ছেন।
শিশু বয়সে ১৯৯৮ সালে ‘টোকাই নাট্যদল’-এ যোগদানের মাধ্যমে নাট্যমঞ্চে তার পথচলা শুরু। নাট্যগুরু শেখ মেহেদী হাসান সাজু তাকে শিল্পের আলো ধরতে শেখান। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় তার প্রতিভা ছড়িয়ে পড়েছে আবৃত্তি, অভিনয় ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে।
তারিকুল আমিন শুধু মঞ্চে নয় টেলিভিশন ও বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছেন। তার অভিনীত জনপ্রিয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে
ধারাবাহিক নাটক: ‘নাবিলা চরিত্র’ – আকরাম খান; ‘আলো আমার আলো’ – আবুল হায়াত; ‘রংধনু’; ‘আরাধনা’; ‘মা’; ‘নাও খেলা’; ‘আয়নায় মুখ’ ইত্যাদি।
একক নাটক: ‘প্রথম প্রেম টোকাই’ – সাগর জাহান; ‘গলির ধারের ছেলেটি’ – জাকির হোসেন; ‘বড় আশা করে’ – মিজানুর রহমান রাতুল।
বিজ্ঞাপন: ম্যাজিক টুথ পাউডার (জনপ্রিয় সংলাপ: “আমার নাম মফিজ, ভাড়া হচ্ছে ৩০!”); গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, দুর্নীতি প্রতিরোধ সচেতনতা।
চলচ্চিত্র: ‘ভাড়াটিয়া প্রেমিক’; ‘মনের মানুষ’; ‘নয়া মানুষ’।
মঞ্চনাটক: ‘রোজিনা’; ‘উপলব্ধি’; ‘পানা’—টোকাই নাট্যদল; ‘ক্লিপেট্ট্রা’; ‘রাজা বাহাদুর —নান্দনিক নাট্য সম্প্রদায়।
রায়েরবাজার বধ্যভূমির ইতিহাসভিত্তিক নাটক ‘চোখবাঁধা মাইক্রোবাস’ এ তালিকার প্রতিটি কাজই যেন শিল্পের ভিন্ন রূপে তারিকুলকে গড়ে তুলেছে। স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে ও জাতীয় পর্যায়ে ১০০ টির বেশি প্রতিযোগিতায় হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন বা রানার্স-আপ। নাটক–সিনেমা–বিজ্ঞাপন—সব মিলিয়ে ২০০টির বেশি অভিনয় তিনি আমাদের দিয়েছেন।

তারিকুলের সাহিত্যজীবন শুরু পঞ্চম শ্রেণিতে লেখা এক আড়ম্বরহীন কবিতা দিয়ে। আজ তা দাঁড়িয়ে গেছে এক দৃঢ় ভুবনে—কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রাজনৈতিক-সামাজিক বিশ্লেষণ সবই লিখছেন নিয়মিতভাবে জাতীয় পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিনে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত তার প্রথম শিশুতোষ গল্পের বই ‘এলিয়েন খাবে পান্তাভাত’—পাঠকপ্রিয় হয়েছে। শিঘ্রই প্রকাশিত হবে ‘ফুলশয্যার বিভীষিকা’ গল্পগ্রন্থ। ‘ডাকটিকিটের অতীত ও বর্তমান হালচাল’ নিামে গবেষণামূলক বইও আছে তার তালিকায়। এই বইগুলোতে তার চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও ভাষার সৌন্দর্য আরও দ্যুতি ছড়াবে এমন প্রত্যাশা প্রকাশনা অঙ্গনের।

ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কাজ করার অদম্য ইচ্ছা ছিল তারিকুলের। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি কবিতা আবৃত্তি করে মানুষের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। জনতার প্রান্তে পৌঁছে যায় তার কণ্ঠ—তীক্ষ্ণ, অগ্নিময়, কিন্তু মানবতার পক্ষে দৃঢ়। তার বিশ্বাস “রাজনীতি প্রতিহিংসার খেলা নয়; এটি মানবতার মঞ্চ হওয়া উচিত। পরিবারতন্ত্রের বাইরের তরুণদের হাতে নেতৃত্ব আসুক।”
আজ তিনি চিত্রণ আবৃত্তি অঙ্গনের প্রশিক্ষক, উত্তরায়ণ একাডেমির নাটক ও আবৃত্তি প্রশিক্ষক, নব ভাবনা লেখক ফোরামের জয়েন্ট অ্যাম্বাসেডর জেনারেল, ‘কাগজঘর’ সাহিত্য সাময়িকী সংগ্রহশালার সমন্বয়ক।
আবৃত্তিকার, নাট্যশিল্পী, প্রশিক্ষক, লেখক, সংগঠক ও মানবিক সমাজচিন্তার এই তরুণ তারিকুল আমিন খান আগামীর বাংলাদেশে এক বহুমাত্রিক প্রতিভার প্রতিনিধিত্ব করবে এমই প্রত্যাশা এই অঙ্গনের সকলের। তার প্রতিটি যাত্রাই যেন নিজের সীমা ভেঙে আরো বড় কিছু হওয়ার এক নিরলস অন্বেষণ। তার জীবনযাত্রা বলে স্বপ্ন ছোট ঘরেও জন্ম নিতে পারে, কিন্তু তা দেশের আকাশ আলোকিত করার শক্তি রাখে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত