ডেস্ক রিপোর্টঃ
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) আরো ১১৮৬ জন ভুয়া সনদধারী শিক্ষককে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে চার শতাধিক শিক্ষকের সনদ জাল ও ভুয়া এবং তিন শতাধিক শিক্ষকের সনদ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব শিক্ষকের কাছ থেকে বেতন-ভাতা হিসেবে তাদের নেওয়া ২৫৩ কোটি টাকা আদায় করতে সুপারিশ করেছে অধিদপ্তর। এ ছাড়া সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া ৭৯৩ একর জমি উদ্ধারেও ডিআইএ সুপারিশ করেছে।
ডিআইএ ও মাউশি অধিদপ্তর সূত্র গণমাধ্যমকে জানায়, জাল সনদ ধরা হলেও ঘুষের বিনিময়ে মন্ত্র্রণালয় থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ডিআইএ গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাল সনদ বিরোধী অভিযানে ১ হাজার ১৮৬ জনকে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগে রয়েছে ৭৭৯ জন, খুলনা বিভাগে ১৭৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪ জন ও ঢাকা বিভাগে ৭০ জন। পুলিশের সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ আরও ১৩৪ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের তালিকা পাঠিয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা অধিদপ্তর আলাদা তদন্ত করে ১২০ জন শিক্ষকের জাল সনদ বাতিল করে তাদের ইনডেক্স কর্তন করেছে। ধরা পড়া জাল সনদের মধ্যে রয়েছে এনটিআরসিএ শিক্ষক নিবন্ধন, জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, রয়েল, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ, যেটাকে নেকটার সনদ বলা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন একাডেমিক সনদও রয়েছে। চিহ্নিত হওয়া জাল সনদের মধ্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ রয়েছে ১৪৮টি ও শিক্ষক নিবন্ধন বা এনটিআরসিএ সনদ ১২০টি। বাকিগুলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সনদ।
ডিআইএর প্রধান কাজ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থায় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংস্থাটি গত এক বছরে চার শতাধিক শিক্ষকের জাল ও ভুয়া সনদ চিহ্নিত করে তাদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আরও তিন শতাধিক শিক্ষকের সনদ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া ৭৯৩ একর জমি উদ্ধারে সুপারিশ, ভুয়া নিয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ এবং ভ্যাট, আইটিসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করেছ সংস্থাটি।
ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমি যোগদান করেই জাল সনদ ধরতে একটি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছি। সেই অভিযানে চার শতাধিক ভুয়া সনদ, তিন শতাধিক অগ্রহণযোগ্য সনদ চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সামনে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তিনি জানান, সুপারিশে এসব শিক্ষকের এমপিও বাবদ নেওয়া অর্থ (বেতন-ভাতা) ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এখন নিয়মানুযায়ী চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার আগে শিক্ষাগত সব সনদ যথাযথভাবে যাচাই করার কথা। কিন্তু জাল সনদ জানার পরও অবৈধ সুবিধা নিয়ে বিষয়টি চেপে যান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ফলে সনদ জাল হওয়ার পরও তারা এমপিওভুক্ত হয়ে যান। পেতে থাকেন বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি অর্থও। তবে এনটিআরসিএর মাধ্যমে অনলাইনে সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার পর জাল সনদের হার কিছুটা কমেছে।
ঘুষ নিয়ে জাল সনদ ছাড় বাণিজ্য: ডিআইএতে জাল সনদধারী শিক্ষকদের ফাইল আটকে রেখে এক ধরনের বাণিজ্যে হতো। কয়েকজন পরিদর্শক সিন্ডিকেট করে জাল সনদের নামে এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সূত্র বলছে, এই সিন্ডিকেটের প্রধান ছিলেন ২৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম মাসুম। সিন্ডিকেটে আরও ছিলেন পরিদর্শক মনকিউল হাসানাত, ডিডি আবুল কালাম আজাদ, আবদুস সালাম আজাদ, ও আবুল কালাম আজাদ, সাদিয়া সুলতানা, আশরাফুল রহমান খান, বদরুল আলম, শ্যামাপ্রসাদ সাহা, আবদুল্লাহ আল মামুন ও হাবিবুর রবহমান। তারা হাজার হাজার ফাইল আটকে রেখেছিলেন, যার বেশিরভাগই ছিল ভুয়া সনদধারী শিক্ষকদের ফাইল। এসব ফাইল নতুন করে যাচাই-বাছাই করতে গিয়েই বেরিয়ে এসেছে জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র।
এ বিষয়ে ডিআইএ পরিচালক সহিদুল ইসলাম বলেন, কয়েক হাজার ফাইল অনিষ্পত্তি অবস্থায় ছিল। এখন সেই ফাইল যাচাই করতে গিয়ে দেখি বেশিরভাগ ফাইল জাল সনদ-সংক্রান্ত। এসব ফাইলে কী হয়েছিল তা বুঝে নেন।
ডিআইএর কড়া সতর্কতা, অভিযোগ জানালে পরিচয় গোপন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) পরিদর্শনের নামে যে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন থেকে সবাইকে কঠোরভাবে সতর্ক থাকতে বলেছে। দৈনিক আমাদের বার্তার প্রিন্ট ভার্সনে ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে অধিদপ্তর জানিয়েছে, তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অফিস আদেশ ছাড়া কোনো পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না এবং এই কাজের জন্য অর্থ লেনদেন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
ডিআইএ বলেছে, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা পরিচালনা করে। এই অডিট চলাকালীন যদি কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে কোনো ধরনের টাকা দাবি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অধিদপ্তরকে মোবাইল বা ইমেইলে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে। অভিযোগ তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখা হবে বলেও জানানো হয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত