স্টাফ রিপোর্টারঃ
রাজধানীর ব্যস্ততম গুলিস্তান ও বঙ্গবাজার এলাকা। যেখানে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, সেখানেই গত সাড়ে তিন দশক ধরে গেড়ে বসেছেন এক ‘অঘোষিত সম্রাট’। নাম তার মোজাম্মেল হক মজু। গত ৩৫ বছর ধরে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের সভাপতি পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি আর সিন্ডিকেট বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের এক বিশাল মহাসমুদ্র।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, সরকার বদলায়, কিন্তু বদলায় না মজুর ভাগ্য। প্রতিটি শাসনামলেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে অপরাধের সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখা এই মাফিয়া ডনের বিরুদ্ধে এবার মুখ খুলতে শুরু করেছেন অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা। বেরিয়ে আসছে তার শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
রাজনৈতিক মুখোশ ও দ্বিমুখী মাফিয়া সিন্ডিকেট:
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের এমপি আফজালের আশীর্বাদে এক শক্তিশালী ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন মজু। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই তিনি গুলিস্তান ও ফুলবাড়ীয়া এলাকার মার্কেটগুলোতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। অবাক করার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপির সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও টাকার জোরে তিনি বাগিয়ে নেন লক্ষ্মীপুর জেলা রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের পদ। এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো সরকারই তার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস পায়নি।
৫ই আগস্টের পর ভোলবদল ও নতুন ত্রাস:
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর গত ৫ই আগস্টের পর মঞ্জু তার রূপ পরিবর্তন করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ছিটিয়ে বিএনপির কিছু সুবিধাবাদী নেতাকে ম্যানেজ করে তিনি পুনরায় গুলিস্তানের দখল নিয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা ট্রেড সেন্টার, গুলিস্তান পুরান বাজার, মহানগর কমপ্লেক্স এবং এনেক্সকো টাওয়ারসহ প্রায় প্রতিটি মার্কেট তার কব্জায়। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মজুর এই নতুন সাম্রাজ্যের প্রতিবাদ করলে জুটছে মারধর, দোকান দখল, এমনকি গুম ও খুনের হুমকি।
সম্পদের ‘মহাসমুদ্র’: কোথায় নেই মজুর ভাগ?
মোজাম্মেল হক মজুর অবৈধ সম্পদের তালিকা পিলে চমকানোর মতো। তার প্রধান তিন সহযোগী আব্দুর রহমান কেরানী, জসিম উদ্দিন কেরানী ও মো. আনোয়ার হোসেন এবং তার মেয়ে-জামাতা এই বিশাল সাম্রাজ্যের হিসাব রক্ষক হিসেবে কাজ করেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী তার সম্পদের একটি খতিয়ান:
* মার্কেট ও শেয়ার: ফুলবাড়ীয়ার এনেক্সকো টাওয়ারে তার নামে-বেনামে ৭টি ডিরেক্টর শেয়ার (মূল্য ৩০ কোটি টাকা) এবং ১ থেকে ৮ তলা পর্যন্ত রয়েছে ৩০টি বিলাসবহুল দোকান (মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা)। এছাড়া মহানগর কমপ্লেক্স ও সিটি প্লাজায় রয়েছে আরও কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।
* আবাসিক ভবন: যাত্রাবাড়ী ও বাগানবাড়ী এলাকায় দুটি বহুতল ভবন, সেগুনবাগিচা ও ওয়ারীতে ৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং মিরপুর বিজয় রাকিন সিটিতে রয়েছে ২টি ফ্ল্যাট।
* জমি ও আলিশান বাড়ি: নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় কয়েক বিঘা জমি এবং নিজ এলাকা রামগঞ্জে ৫ কোটি টাকা মূল্যের ১ একর জমিতে তৈরি করেছেন এক বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি।
* দোকান জালিয়াতি: ঢাকা ট্রেড সেন্টারের সভাপতি থাকাকালীন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের নাম ভাঙিয়ে ৩৫০টি অবৈধ দোকান নির্মাণ করে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে সেগুলো বৈধ করার কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আরও ২৭ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
চোরাচালান ও সুদের কারবার:
মজুর বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্ত আমদানির আড়ালে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং শাড়ি চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া গুলিস্তান এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে চড়া সুদে কোটি কোটি টাকা খাটানো এখন ওই এলাকার ‘ওপেন সিক্রেট’।
দুদক ও প্রশাসনের নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন:
ইতিমধ্যেই ৫টি জাতীয় দৈনিকে মজুর দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। একজন ভুক্তভোগী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করার পর তাকে তলব করা হলেও অদৃশ্য কোনো এক ক্ষমতার প্রভাবে সেই তদন্ত ফাইলবন্দি হয়ে আছে। ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন—জনগণের টাকা আত্মসাৎকারী এবং ত্রাস সৃষ্টিকারী এই ব্যক্তি কি তবে আইনের ঊর্ধ্বে?
দলের ভাবমূর্তি সংকটে বিএনপি:
মজু ও তার ক্যাডার বাহিনীর অপকর্মের দায়ভার এখন পড়ছে বিএনপির ওপর। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের মতে, মজুর মতো বিতর্কিত ব্যক্তিকে দলে রাখা মানেই দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা। তাকে এখনই বহিষ্কার না করলে দল চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
বর্তমানে মজু দাম্ভিকতার সাথে দাবি করছেন, "সব ওপর মহল ম্যানেজ করে ফেলেছি।" তবে সাধারণ জনতা ও ব্যবসায়ীদের একটাই দাবি—বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন এই "মহাসাগর চুরির" সুষ্ঠু তদন্ত করে মজুসহ তার সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত