মোহাম্মদ মাসুদ॥
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকায় গড়ে ওঠা লাখ লাখ ভবনের অনুমোদিত কোনো নকশা নেই। এগুলো নকশাবিহীন এবং অবৈধ— বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও এগুলো অপসারণ করা বা কঠোর কোনো পদক্ষেপে যেতে পারেনি রাজউক। তবে, শেষ পর্যন্ত এসব স্থাপনা ও ভবনের বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে সংস্থাটি।
সেই নীতিমালায় প্রস্তাব ও সুপারিশ করা হয়েছে যে, যেসব ভবন ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে, রাজউকের মাস্টারপ্ল্যানের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে, সেগুলোকে বৈধতা দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে খসড়া নীতিমালার সুপারিশে বিদ্যমান নকশা অনুমোদন ফির তিন থেকে পাঁচ গুণ জরিমানা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, খসড়া নীতিমালাটি নগর উন্নয়ন কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তারাও বেশকিছু সুপারিশ দিয়েছে।
এদিকে, ৩৮ বছর পর রাজউক আইন অধ্যাদেশ আকারে সংশোধন হতে যাচ্ছে। সংস্থাটির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বেশকিছু শাস্তির বিধানও রাখা হচ্ছে। রাজউকের বিদ্যমান আইনের নাম ‘টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩’, যা যুগোপযোগী করে এখন ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অধ্যাদেশ-২০২৫’ নামে অভিহিত হবে।
রাজউক আইনে বড় পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে— কেউ রাজউকের মাস্টার প্ল্যান অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। তবে, একই অপরাধ অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা গুনতে হবে।
রাজউকের প্রস্তাবিত খসড়া অধ্যাদেশে আরও নতুন কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হলো-
• নগর পুনঃউন্নয়ন : শহরের ঝুঁকিপূর্ণ, জরাজীর্ণ এলাকাকে বসবাস উপযোগী করা হবে। পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে ওই এলাকার জীবনমান, অর্থনৈতিক অবস্থা ও কাঠামো উন্নয়ন করে বসবাস উপযোগী হিসাবে তৈরি করা যাবে।
• ভূমির পুনর্বিন্যাস : রাজউক এলাকার একাধিক মালিকানাধীন খণ্ডিত জমিগুলো একীভূত করে একক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। পরিকল্পনার আওতায় প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সব ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো (যেমন- রাস্তা, ড্রেন, পার্ক ও গণপরিসর) অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
• মূল্যবৃদ্ধিজনিত সুবিধা গ্রহণ : রাজউক এলাকায় সরকারি কোনো উন্নয়নকাজের ফলে যদি ওই এলাকায় ভূমির মূল্য বেড়ে যায়, সেক্ষেত্রে সরকার ওইসব ব্যক্তির বা জায়গার মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করবে।
এছাড়া, খসড়া প্রস্তাবনায় বেশ কিছু শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো-
• কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে সড়ক বা কোনো ইমারতের পাশে বিধিমোতাবেক সংরক্ষিত খোলা জায়গায় ১০ ফুটের বেশি দেওয়াল বা ভবন নির্মাণ করলে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে।
• রাজউক এলাকার কোনো ব্যক্তি পূর্বানুমোদন ছাড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী, খুঁটি বা পোস্ট সরিয়ে ফেললে তাকে দুই বছর জেল অথবা পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হবে।
• কুঁড়েঘর নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা তিন মাসের জেল। অপরাধ অব্যাহত থাকলে পাকা দেওয়াল বা ভবনের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা এবং কুঁড়েঘরের ক্ষেত্রে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা করে জরিমানা করা হবে।
• সড়ক দখল করে স্থাপনা, ভবনের সীমানারেখায় দেওয়াল বা স্থাপনা তৈরির পর রাজউক সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দিলে এবং তা পালন না করলে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। এক্ষেত্রে পাকা দেওয়াল বা স্থাপনা অপসারণ না করলে ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা ছয় মাসের জেল বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।
• রাজউকের কাজে কেউ বাধা দিলে তাকে সর্বোচ্চ চার মাসের কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
• কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া নিচু ভূমি ভরাট কিংবা পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করলে দুই বছরের জেল বা ১০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।
• আদালত কোনো ব্যক্তিকে কোনো দেওয়াল, ইমারত বা স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার পরও তা অপসারণ না করলে দুই বছরের জেল বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।
এদিকে, রাজউক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সংখ্যা পাঁচজন থেকে ১০ জনে উন্নীত করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বোর্ড সদস্য কারা হবেন, তাদেরকে কীভাবে নির্বাচন করা হবে— বিষয়গুলো নিয়ে পেশাজীবীদের কাছ থেকে কিছু প্রস্তাবনা এসেছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগরপরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রধান কাজগুলো না করে শুধু উন্নয়ন কাজের দিকে বেশি আগ্রহী রাজউক। তারা এখন প্রকল্প প্রণয়ন, প্লট ও ফ্ল্যাট তৈরিতে বেশি মনোযোগী। এখান থেকে রাজউককে বেরিয়ে আসতে হবে। আর আমলানির্ভর পরিচালনা পর্ষদ দিয়ে রাজউক ভালোভাবে চলছে না, এটারও পরিবর্তন জরুরি।
রাজধানীতে নকশাবিহীন গড়ে ওঠা ভবনের বিষয়ে খসড়া নীতিমালায় প্রস্তাব করা হয়েছে— আবাসন প্রকল্পগুলো কেস-টু-কেস আবেদনের ভিত্তিতে রাজউকের নিয়ম মেনে বৈধতা দেওয়া যেতে পারে। আর ভবনগুলোর ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ গুণ জরিমানা করার পক্ষে মত দিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তবে, যেগুলো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে গড়ে উঠেছে, সেটা এর আওতায় পড়বে না এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো কমিয়ে একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য মহানগরী গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০২২ সালে রাজউক বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) গেজেট আকারে প্রকাশ করেছিল। সম্প্রতি, সরকার এই ড্যাপ সংশোধনের প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। সংশোধিত ড্যাপে রাজধানীকে আগের ২৭৫টি ব্লকের পরিবর্তে ৬৮টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। গাজীপুরের অংশ বাদ দিয়ে নতুন পরিকল্পনায় ঢাকাকে এক হাজার ৯৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এতে ভবনের উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি সর্বোচ্চ জনঘনত্ব ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়েছে।
এছাড়া, সংশোধিত ড্যাপ এবং খসড়া ‘ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা–২০২৫’ অনুযায়ী, বহু এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, আগে যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচতলা ভবন নির্মাণের অনুমতি মিলত, সেখানে এখন ১০ থেকে ১১ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা যাবে।
নতুন বিধিমালায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যোগ করা হয়েছে। সেটি হলো— কোনো প্লটে যত বেশি খোলা জায়গা রাখা হবে, ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সেই অনুপাতে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া হবে।
পাশাপাশি ‘খসড়া ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০২৫’ এ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। অকুপ্যান্সি সার্টিফিকেট আগে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নবায়ন বাধ্যতামূলক থাকলেও নতুন বিধিমালায় একবার সার্টিফিকেট নিলেই তা আজীবনের জন্য কার্যকর থাকবে। পাঁচ কাঠা বা তার বেশি জমির প্লটে স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পুরোনো বিধিমালা অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের আবেদন করার সময়ই অনুমোদন ফি দিতে হতো, কিন্তু নতুন নিয়মে ভবন নির্মাণের সুপারিশপ্রাপ্তির পর ফি পরিশোধ করতে হবে। আগে আবেদন নিষ্পত্তির সময় ছিল ৪৫ দিন। এখন তা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ দিন করা হয়েছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত