মিজানুর রহমানঃ
এসেছে বসন্ত, বইছে ফালগুনি হাওয়া। যোগ হয়েছে আমের মুকুলের স্বর্ণালী শোভা। অপরুপ সৌন্দর্য আর ঘ্রানে শেরপুরের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগঞ্জের গাছে উঁকি দিচ্ছে কঁচি আমের মুকুল। পাতার ফাঁকে ফাঁকে গুন গুন শব্দে ভ্রমরের গুঞ্জন। কৃষি প্রধান জেলা শেরপুর। জেলাসহ প্রতিটি উপজেলায় শোভা পাচ্ছে আমের মুকুল। জেলা-উপজেলার প্রত্যেক বসতবাড়িসহ বাগানে আমের মুকুলে ছেয়ে গেছে। শিলা বৃষ্টি বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমেরবাম্পার ফলনের আশা চাষিদের। শেরপুর জেলা ধান, গমের জেলা হিসেবে পরিচিত হলেও কৃষকরা ধান ও গমে লোকসানে উচুঁ, নিচু আবাদি জমিতে আম ও বিভিন্ন ফলদ এবং সবজি বাগান গড়ে তুলেছেন।
শেরপুর জেলার ৫ উপজেলায়ই প্রত্যেক বাড়ির আঙিনায় ছাড়াও আম বাগানের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। তাছাড়া বসতবাড়িতেও অনেকেরই বিভিন্ন জাতের আমের গাছ রয়েছে। এসব বাগানের গাছে প্রচুর মুকুল এসেছে। তবে ঝরো হাওয়া, পর্যাপ্ত পরিচর্যা ও পোকার আক্রমণে আমের মুকুল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ও রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন প্রতিনিধি কে বলেন, ঝিনাইগাতিতে বড় কোন আমের বাগান নেই।তবে বিচ্ছিন্নভাবে বসতবাড়ির আশেপাশে ছোট ২-১ টি বাগান রয়েছে। এছাড়াও বসতবাড়িতে প্রচুর আম গাছ রয়েছে। এটি প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলার কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, গাছ টানা ২০-৩০ বছর ফল দেয়। গাছ রোপনের ২ বছরের মধ্যেই আম ধরে। প্রতিকেজি বিক্রী হয় ২০০-২৫০ টাকায়। বাগানে সাথী ফসল হিসেবে আলু ও শাক,হলুদ,আদা সবজী আবাদ ও করতে পারেন। সময়মত কীটনাশক ছিটিয়ে ও পরিচর্যা করলে ভালো ফলন ও দাম পাবেন বলে জানান তারা। ধান ও অন্যান্য ফসল থেকে আম ও লিচু বাগান করে লাভ বেশি পরিশ্রমও কম। আম্রপালি ও লিচু জনপ্রিয় ও রসালো ফল। দেশ-বিদেশে খুবই চাহিদা রয়েছে। বাগানে কম বেশি লাভ হওয়ায় অনেক বেকার যুবক বাণিজ্যিকভাবে আম্রপালির বাগানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। গাছ লাগানোর ২/৩ বছরের মধ্যেই আম পাওয়া যায়। লাগাতার ফল দেয় ১০/১২ বছর। বাগান মালিকরা জানান, আবহাওয়া ভালো থাকলে সর্বোচ্চ ফলন হবে। ফলন এবং রং ভালো রাখার জন্য গাছের গোড়ায় পানি দিচ্ছেন। মুকুল থেকে গুটি বের হলে নিয়ম মাফিক ভিটমিন ও কীটনাশক স্প্রে করবেন। ব্যবসায়ীরা ২/ ৩ বছর চুক্তিতে বাগান ক্রয় করেন। তারাই দেখভালও পরিচর্যা করেন। মালিকের লোকশানেরও চিন্তা থাকেনা। স্বুসাধু ফলের মধ্যে আমে যেমন ঘ্রান, তেমনি স্বাদে মজাদার ও ভিটামিন সমৃদ্ধ। ঝিনাইগাতী উপজেলা সদরের ফল ব্যাবসায়ী বিল্লাল হোসেন বলেন, ফল আসা শুরু করলে গাছ ১৫-২০ বছর টানা ফল দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, আম অনেক পুষ্টি গুন সমৃদ্ধ। উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন সি, ক্ষনিজ লবন রয়েছে। যা শরীরকে সুস্থ-সতেজ রাখে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ভিটামিন ও খনিজ লবন দাত, নখ, চুল মজবুত রাখে। বাগানগুলোয় সাথী ফসল হিসেবে গমসহ সবজিরও আবাদ করা যায়। মুকুল আসা বাগানের পাশ দিয়ে হাঁটলেই মুকুলের ঘ্রাণে মন প্রাণ ভরে ওঠে। উপজেলা উপ-সহকারী এগ্রিকালচার এক্সটেনশন অফিসার ওহেদুজ্জামান নুর বলেন, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বাগান পরিষ্কার রাখা, আগাছা দমন ও রোগাক্রান্ত ডাল ছাঁটাই জরুরি। গাছের বয়স অনুযায়ী গোবর, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সুষম হারে প্রয়োগ করতে হবে। পানি যেন জমে না থাকে, তবে মাটিতে আর্দ্রতা থাকতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিরোধমূলকভাবে ম্যানকোজেব বা কপারজাতীয় ছত্রাকনাশক একবার স্প্রে করা যেতে পারে।
মুকুল বের হওয়ার সময়: সতর্ক নজরদারি এই পর্যায়ে আমের হপার, থ্রিপস বেশি দেখা যায়। ৫-১০ শতাংশ মুকুল বের হলেই বাগান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হপার দেখা দিলে ইমিডাক্লোপ্রিড (২ মিলি/লিটার) গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করা যায়। ছত্রাকজনিত রোগ পাউডারি মিলডিউ ও অ্যানথ্রাকনোজ দমনে হেক্সাকোনাজল বা কারবেন্ডাজিম (২ গ্রাম / লিটার) কার্যকর। তবে পূর্ণ ফুলের সময় অতিরিক্ত স্প্রে পরাগায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাই সতর্কতা জরুরি। ফল সেটিং পর্যায়ে ফল ঝরা রোধ
ফুল ঝরে ছোট ফল ধরার সময় ফল ঝরা বেশি হয়। এ সময় হালকা সেচ ও বোরনসহ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট স্প্রে উপকারী। একই গ্রুপের কীটনাশক বারবার ব্যবহার না করে গ্রুপ পরিবর্তন করতে হবে। মার্বেল সাইজ ফলে পোকা দমন ছোট কাঁচা আমে ফল ছিদ্রকারী পোকা ও ফল মাছির আক্রমণ দেখা যায়। ফল মাছি দমনে ফেরোমন ট্র্যাপ (প্রতি বিঘায় ৪-৬টি) ব্যবহার কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব। আক্রমণ বেশি হলে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক (১ মিলি/লিটার) ব্যবহার করা যায়।
বৃষ্টির পর ছত্রাকনাশক স্প্রে করলে অ্যানথ্রাকনোজ কমে। ফল বড় হওয়া থেকে পাকা পর্যন্ত ১৫-২০ দিন পরপর বাগান পরিদর্শন জরুরি। ভারী ফলের চাপে ডাল ভেঙে গেলে সাপোর্ট দিতে হবে। সংগ্রহের অন্তত ১৫-২০ দিন আগে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে, যাতে ফল নিরাপদ থাকে। ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি অফিসার ফরহাদ হোসেন প্রতিনিধি কে বলেন, আবহাওয়া ভাল থাকায় ব্যাপক মুকুল দেখা যাচ্ছে। আশা করা যায় ব্যাপক ফলন হবে। শিলাবৃষ্টি বা ঝড় না হলে আমের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করেন তিনি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত