সবুজ বাংলাদেশ ডেস্ক॥
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুস সালাম ব্যাপারীর পরিবারের কানাডায় বাড়ি রয়েছে। ২০১৮ সালে আব্দুস সালাম ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী মাহবুবুন্নেছার নামে বাড়িটি কেনা হয়। ২০২৩ সালে বাড়িটির মালিকানার অংশ থেকে আব্দুস সালামের নাম বাদ দিয়ে তাঁর এক ছেলের নাম দেওয়া হয়। পরে পুরো মালিকানা স্থানান্তর করা হয় তাঁর স্ত্রীর নামে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে আব্দুস সালামকে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে তিনি ছিলেন একই সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। এ পদে চাকরিকালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এবার কানাডায় তাঁর স্ত্রীর নামে বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেল।
বাড়িটি কানাডার টরন্টোতে। স্থানীয় ভূমি নিবন্ধন অফিস সার্ভিস অন্টারিও থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ আব্দুস সালাম ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী মাহবুবুন্নেছার নামে বাড়িটি কেনা হয়। স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, বাড়িটির বর্তমান দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ কোটি টাকা। কেনার সময় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বাড়িটি কেনা হয় বুইয়ং–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইনসান ইয়ামের কাছ থেকে।
কানাডায় বাড়ি থাকার বিষয়টি নিয়ে জানতে আব্দুস সালাম ব্যাপারীকে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ফোন করা হয়। তখন তিনি বলেন, বাড়িটি তাঁর সন্তানেরা কিনেছেন। সন্তানেরা কী করেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা সবাই পেশাজীবী। কথা বলার একপর্যায়ে আব্দুস সালাম তাঁর অফিসে যাওয়ার জন্য বলেন এবং ‘ব্যক্তিগত’ বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে মামলা করার হুমকি দেন।
২০১৮ সালে আব্দুস সালাম ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী মাহবুবুন্নেছার নামে বাড়িটি কেনা হয়। ২০২৩ সালে বাড়িটির মালিকানার অংশ থেকে আব্দুস সালামের নাম বাদ দিয়ে তাঁর এক ছেলের নাম দেওয়া হয়। পরে পুরো মালিকানা স্থানান্তর করা হয় তাঁর স্ত্রীর নামে।
আব্দুস সালাম ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলতে গত রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা ওয়াসার কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। তখন আব্দুস সালাম ব্যাপারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি বৈঠকে ব্যস্ত। পরে তাঁর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হবে।
ওই দিন বেলা দুইটার কিছু পরে আব্দুস সালাম ব্যাপারীর মুঠোফোনে এবং ঢাকা ওয়াসার জনতথ্য কর্মকর্তার পক্ষ থেকে প্রশ্ন পাঠানো হয়। জানতে চাওয়া হয়, বাড়িটি কবে কেনা হয়েছে, কীভাবে কেনা হয়েছে, সন্তানদের আয়ের উৎস কী, কবে পড়াশোনা শেষ করে তাঁরা চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এবং বাড়ি কেনার তথ্য সরকারকে জানানো হয়েছে কি না?
সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণবিধি অনুযায়ী, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো সম্পদ অর্জন করতে হলে তা সরকারকে আগে জানিয়ে অনুমোদন নিতে হয়। বিষয়টি নিয়ে সরকারি চাকরি আইনের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, কোনো সরকারি চাকরিজীবীর সন্তান যদি বাবার নামে সম্পদ কেনেন, সেটাও আগে জানাতে হবে এবং অর্থের উৎস উল্লেখ করতে হবে।
কানাডার টরন্টোতে আব্দুস সালামের নামে থাকা বাড়ির ঠিকানা ধরে গুগল স্ট্রিট ভিউতে এই বাড়ি পাওয়া যায় ঢাকা ওয়াসা সূত্রের দাবি, ২০০৮ সালের দিকে দুই ছেলেকে নিয়ে কানাডায় যান আব্দুস সালাম ব্যাপারীর স্ত্রী মাহবুবুন্নেছা। মাহবুবুন্নেছা নিজেও ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। যথাসময়ে দেশে ফেরত না আসায় তিনি আর চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। সূত্র আরও বলছে, সালামের দুই সন্তান যখন পড়াশোনায় ছিলেন, তখন তাঁদের কানাডায় নিয়ে যান মাহবুবুন্নেছা।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আব্দুস সালাম ব্যাপারীর নিয়োগ হয় গত বছর ১১ নভেম্বর। তাঁর নিয়োগে তাড়াহুড়া ছিল। একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তির শর্ত। নিয়োগের যোগ্য করতে তাঁকে পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। এরপর কোনো ধরনের সাক্ষাৎকার ছাড়াই তিনজনের তালিকায় আব্দুস সালামের নাম সবার ওপরে দিয়ে পাঠানো হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় আব্দুস সালামকেই নিয়োগ দেয়।
আব্দুস সালাম ও মাহবুবুন্নেছার ছেলে আবরার মাহেরের লিংকডইন প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২১ সালে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আরেক ছেলে ওয়ালিদ সাহের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন ২০১৭ সালে। পড়াশোনার সময় বিভিন্ন জায়গায় কাজের অভিজ্ঞতার কথাও তাঁরা লিংকডইন প্রোফাইলে উল্লেখ করেছেন।
ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, দুই ছেলের চাকরির আয় দিয়ে ২০১৮ সালে বাড়ি কেনার দাবিটি ঠিক কিনা, তা দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দিয়ে তদন্ত করানো যায়।
কানাডায় বহু বাংলাদেশির বাড়ি রয়েছে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা অনেক বাড়িতে বাংলাদেশি নাগরিকদের স্ত্রী ও সন্তানেরা বাস করেন। এ কারণে ওই সব এলাকা ‘বেগমপাড়া’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কানাডায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা ও পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনা নিয়ে অতীতে অনেক কথা হয়েছে, কাজ তেমন একটা হয়নি।
জানতে চাইলে নতুন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত ভদ্রলোককে চিনি না, নামও জানি না। তাঁর সঙ্গে আমাদের এখন পর্যন্ত মিনিস্ট্রিতে কোনো কথা হয়নি।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে দুই সপ্তাহ পার হয়নি। মন্ত্রণালয় সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা তিনি এখনো নিতে পারেননি। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে পরে বিস্তারিত বলা যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আব্দুস সালাম ব্যাপারীর নিয়োগ হয় গত বছর ১১ নভেম্বর। ওই দিন স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে তিন বছরের জন্য এ নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর নিয়োগে তাড়াহুড়া ছিল। তাঁকে নিয়োগের দিনই একটি প্রজ্ঞাপনে ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
আব্দুস সালাম ব্যাপারীকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তির শর্ত। নিয়োগের যোগ্য করতে তাঁকে পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। এরপর কোনো ধরনের সাক্ষাৎকার ছাড়াই তিনজনের তালিকায় আব্দুস সালামের নাম সবার ওপরে দিয়ে পাঠানো হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় আব্দুস সালামকেই নিয়োগ দেয়। যদিও আবেদনকারী প্রার্থীদের মধ্যে অনেক অভিজ্ঞ ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তা ছিলেন; তাঁদের ডাকাই হয়নি।
তখন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগের দিন গত ১০ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।
ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ পর্যায়ে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পুরোনো। আওয়ামী লীগ আমলেও প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশ ছাড়েন তাকসিম।
ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, আব্দুস সালামের বিরুদ্ধ দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছিল। এ কারণে বিগত সরকারের আমলে তাঁকে প্রায় চার বছর প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে সংযুক্ত করে রাখা হয়, যা অনেকটা জনপ্রশাসনের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখার মতো। অর্থাৎ কোনো কাজ দেওয়া হয় না। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আব্দুস সালাম নিজেকে বঞ্চিত দাবি করতে শুরু করেন এবং প্রভাব বিস্তার করে বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহার করান।
১৯৯১ সালে ঢাকা ওয়াসায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন আব্দুস সালাম ব্যাপারী। ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, চাকরিজীবনে বিভিন্ন পদে তিনি আড়াই কোটি টাকার মতো বেতন–ভাতা পেয়েছেন। চাকরিজীবনে তিনটি বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আব্দুস সালাম ব্যাপারী। এসব প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন এবং অবৈধ উপায়ে অর্থ পাচার না করা হলে কোনো অবস্থাতেই কানাডায় বাড়ি কেনা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার এ ধরনের সম্পদ অর্জন করা অস্বাভাবিক। কানাডার ওই বাড়ির মালিক যে তিনি নিজেই, সেটা লুকানোর জন্য মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন।
সূত্র: প্রথম আলো
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত