সবুজ বাংলাদেশ ডেস্ক॥
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে শীর্ষ পদে নিয়োগকে ঘিরে আবারও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) আবুল বাশারের নাম। একাধিক গুরুতর অভিযোগ, রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, এমনকি আলোচিত একটি গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলায় নাম থাকা সত্ত্বেও তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন- এমন আলোচনা ব্যাংকপাড়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যাংকের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা, সাবেক প্রশাসনিক সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, আবুল বাশার আওয়ামী লীগ আমলে দীর্ঘদিন ধরে অগ্রণী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, পদায়ন, বদলি এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি দ্রুত নতুন বাস্তবতায় নিজেকে মানিয়ে নিয়ে নিজের প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখেছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার মানদণ্ড আদৌ কতটা কার্যকর?
রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগে নতুন বিতর্ক:
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিগত সরকারের সময় রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাংকিং খাতেও রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই সময় অনেক কর্মকর্তা নিজেদের ‘অতি আওয়ামী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় নামেন। অভিযোগ অনুযায়ী, আবুল বাশার ছিলেন এই ধারার অন্যতম আলোচিত কর্মকর্তা।
ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তিনি শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেই নন, বরং একটি রাজনৈতিক বলয়ের কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের ভেতরে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, যা পদোন্নতি থেকে শুরু করে সংবেদনশীল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলত।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“ব্যাংকের ভেতরে কার কোথায় পোস্টিং হবে, কে পদোন্নতি পাবে, কে প্রশাসনিক সুবিধা পাবে- এসব ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের প্রভাব ছিল। সেই বলয়ের কেন্দ্রে আবুল বাশারের নামই বেশি উচ্চারিত হতো।”
আন্দোলনবিরোধী অবস্থান ও ‘লাল প্রোফাইল’ আতঙ্ক:
২০২৪ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় ব্যাংকের অভ্যন্তরে ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থানের অভিযোগও উঠেছে। সূত্রগুলো বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “লাল প্রোফাইল” ব্যবহারকারী বা সরকারবিরোধী মনোভাব আছে বলে সন্দেহ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এতে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এক ধরনের আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক কর্মকর্তা নিজেদের মতপ্রকাশে সংযমী হয়ে পড়েন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থনে প্রকাশ্য মিছিলে অংশ নেওয়া কিছু কর্মকর্তাকে পরবর্তীতে সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন করা হয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডে উচ্চপর্যায়ের নীরব সমর্থন ছিল।
গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলায় নাম, তবু এমডি দৌড়ে?:
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো- জুলাইয়ের গণহত্যা-সংক্রান্ত একটি মামলায় নাম থাকা সত্ত্বেও আবুল বাশারের নাম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে আলোচনায় রয়েছে। জানা গেছে, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা সিআর-১৭৬ নম্বর মামলায় তিনি ৬৮ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এমন একটি গুরুতর মামলায় নাম থাকার পরও তাকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বিবেচনা করা হলে তা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। ব্যাংকিং খাতের এক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন,“রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নিয়োগের আগে নৈতিক যোগ্যতা, আইনি অবস্থান এবং প্রশাসনিক সততার বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার কথা। সেখানে এ ধরনের অভিযোগ থাকা ব্যক্তি যদি দৌড়ে এগিয়ে থাকেন, তা উদ্বেগজনক।”
‘খাম বাশার’ উপাধি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ:
অগ্রণী ব্যাংকের অভ্যন্তরে আবুল বাশারকে “খাম বাশার” নামে ডাকা হয়- এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। সূত্রগুলোর দাবি, এইচআর বিভাগের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এবং পদোন্নতি কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। বিশেষ করে ২০২৪ সালে এজিএম পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিতদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “যোগ্যতা নয়, কে কতটা প্রভাবশালী বা কার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারছে—এসবই যেন তখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।” এ ধরনের অভিযোগ ব্যাংকের মেধাভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বদলি-নিয়োগ বাণিজ্যের বিস্তৃত বলয়:
অভিযোগ রয়েছে, বদলি ও নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক বলয় তৈরি হয়েছিল। ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পদায়ন, জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রশাসনিক বদলিতে তার প্রভাব ছিল বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকপাড়ায় এখন আলোচনা- রং বদলালেও প্রভাবের ধরন বদলায়নি।
অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ:
আবুল বাশারের বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আত্মীয়-স্বজনের নামে খোলা হিসাব ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা হতো। যদিও এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। অন্যদিকে আরও অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হতো।
নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক:
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি হলো নারী নিপীড়ন ও অশোভন আচরণের অভিযোগ। ব্যাংকের একাধিক নারী কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, তার আচরণে তারা নিরাপদ বোধ করেন না। অনেকেই অফিসিয়াল কাজেও তার কক্ষে একা যেতে ভয় পান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী কর্মকর্তা বলেন,“আমরা অনেকে প্রয়োজন ছাড়া তার কক্ষে যাই না। অফিসের ভেতরেও অস্বস্তি কাজ করে।” এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতার বিষয় নয়, বরং কর্মপরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে আনে।
৫ আগস্টের পরও সক্রিয় প্রভাব বলয়:
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও আবুল বাশার তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে নতুন বলয় গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, এই বলয়ের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদায়ন এবং কর্মকর্তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরে নিরপেক্ষতা ও সুশাসনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক কর্মকর্তা।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি:
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতগুলো বহুমাত্রিক অভিযোগের পরও যদি তাকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বিবেচনা করা হয়, তবে তা নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা সংকট তৈরি করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত জরুরি। শুধু প্রশাসনিক অনুসন্ধান নয়, প্রয়োজনে আর্থিক ও নৈতিক আচরণ সংক্রান্ত পৃথক তদন্ত হওয়া উচিত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সেখানে শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বা বিতর্কিত ব্যক্তির উত্থান গোটা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিএমডি হিসেবে প্রমোশন উদযাপন:
অফিসিয়াল কর্মসূচি না থাকা সত্ত্বেও অতি উৎসাহি হয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেয়ার জন্য টুঙ্গিপাড়া মুজিবের মাজারে ফুল দেয়ার জন্য যায়। শুধু ফুল দিয়েই ক্ষান্ত হননি, ফুল দেয়ার ছবি ও ভিডিও তা আবার বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো হয় নিজের অতি উৎসাহী আওয়ামীলীগ প্রমাণ করার জন্য।
শেষকথা
অগ্রণী ব্যাংকের ডিএমডি আবুল বাশারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিতর্ক নয়; এটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে এনেছে। গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলায় নাম, ঘুষ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ, নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ- এসবের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া শীর্ষ পদে তার নাম আলোচনায় থাকা ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাদের হাতে যাবে- এ প্রশ্নের উত্তর এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, জনআস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
সূত্র: শীর্ষনিউজ
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত