নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের মানুষ যখন ১৭ বছরের রাজনৈতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসিতে (ইবিএল) উন্মোচিত হচ্ছে ১৮ বছর ধরে চেপে বসা আরেক স্বৈরাচারের মুখ। এমডি আলী রেজা ইফতেখার যেন ব্যাংকের ভেতরেই তৈরি করেছেন নিজস্ব এক ‘আয়নাঘর’, যেখানে নারী কর্মীদের প্রতি ‘টার্গেটিং’, যৌন হয়রানি এবং মানসিক নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতসব কুকর্মের পরেও তার খুঁটির জোর কোথায়? উত্তর মিলছে চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর রহস্যজনক নীরবতায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নীরবতা মূলত পারস্পরিক অপরাধের অঘোষিত ‘ইনডেমনিটি’। দেশের স্বৈরাচারী সরকার যেমন দোসরদের দিয়ে টিকে ছিল, তেমনি ইবিএলে চেয়ারম্যান দূর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রধান ‘দোসর’ ও রূপকার হলেন এই এমডি। উভয়েই একে অন্যের অপরাধের সহযোগী হিসেবে নিজের ইচ্ছা চরিতার্থ করার অবাধ লাইসেন্স দিয়েছেন একে অন্যকে।
২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে একটি ব্যাংকের এমডি পদে আছেন আলী রেজা। যে কারণে তিনি ব্যাংকের মধ্যে অনায়াসে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন। আর তার ও তার সহযোগীদের কারণে নারী কর্মীদের জন্য ইবিএলের কর্মপরিবেশ হয়ে উঠেছে বিষাক্ত। কিন্তু মুখ খোলার সাহস কারোই নেই। প্রতিবাদ বা প্রত্যাখ্যান করার শাস্তি যে বড়ই করুণ।
এসব বিষয় নিয়ে সংস্থাগুলোর তদন্তের মধ্যেই সামনে এসেছে মেধাবী নারী ব্যাংকার তামান্না কাদিরের মৃত্যু। মেধাবী ব্যাংকার তামান্না কাদির চেয়েছিলেন করপোরেট জগতে নিজের যোগ্যতা দিয়ে শক্ত অবস্থান গড়তে। কিন্তু ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল) চাকচিক্যময় কাঁচের দেয়ালের ভেতরে যে এক ভয়ংকর ‘পশুত্ব’ লুকিয়ে আছে, তা তিনি জানতেন না। পদোন্নতি আর ‘প্রায়োরিটি’র আড়ালে তাকে আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এক অনৈতিক ফাঁদে। সেই ফাঁদ থেকে সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়ে তামান্নাকে লড়তে হয়েছে এক অসম যুদ্ধ। তাঁর মৃত্যুর আগে সহকর্মীদের কাছে দেওয়া বক্তব্য, সাবেক সহকর্মীদের সাক্ষ্য এবং অন্যান্য ভুক্তভোগীর অভিযোগে ব্যাংকের অভ্যন্তরে আলী রেজা ইফতেখার কেন্দ্রীক একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত মিলছে।
ভুক্তভোগী ও তাদের সহকর্মীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, ব্যাংকের নারী কর্মীদের মধ্যে যারা সুন্দরী, তাদের সুকৌশলে ‘টার্গেট’ করতেন এমডি আলী রেজা ইফতেখার। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যদিও তামান্না কাদিরের পারফর্মেন্স অনেক ভাল ছিল কিন্তু তাকে ‘প্রায়োরিটি ব্যাংকিং’-এ পোস্টিং দেওয়া হয় এই উদ্দেশেই।
অভিযোগ রয়েছে, কনজিউমার লিডারশীপ টিম মিটিং প্রতি বছর দেশে হলেও ২০১৪ সালের মে মাসে সেটার আয়োজন করা হয় নেপালে। এবং উক্ত অফিসিয়াল ট্যুরের নাম করে তাকে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। তামান্নার বক্তব্যে বলা হয়, উক্ত নেপাল ভ্রমনের আগে থেকেই তামান্নার দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করে ইফতেখারের সিণ্ডিকেট। সেখানে গিয়ে তামান্না আবিষ্কার করেন এক ভিন্ন জগত — স্ট্রিপ বার, মদ্যপ অবস্থায় রাতে রুমে ডাকাডাকি এবং অনৈতিক আবদার।
তামান্না কাদির নিজের নীতিতে অটল থেকে সেই আবদার প্রত্যাখ্যান করেন এবং অন্য কোন কনজিউমার লিডারশীপ টিম মিটিংয়ে দেশের বাহিরে যেতে অস্বীকৃতি জানান। আর এখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনের দুর্বিষহ অধ্যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এমডির ‘টার্গেট’ করা নারীদের বশ করতে ব্যাংকে সক্রিয় রয়েছে শারমিন আতিকের নেতৃত্বে এক নারী সিন্ডিকেট। সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বিষয়গুলি নিশ্চিত করেছেন যে, শারমিন আতিক এবং তাসমিন হোসাইন মিলে বর্তমানে টার্গেট করা নারীদের এমডির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করার বা ‘ম্যানেজ’ করার কাজ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান যে, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাসমিন হোসাইনের বাসাটিকে ব্যবহার করা হয় এমডির ‘জলসা ঘর’ হিসেবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বিশেষ মহলের নিরাপত্তা ও প্রটোকল নিশ্চিত করেন এমডির আত্মীয় পরিচয়দানকারী ইবিএলের এজেন্ট ব্যাংকিং প্রধান শরফুদ্দিন নিউটন এবং অ্যাডমিন ডিপার্টমেন্টের খুররম আলমগীর।
তামান্নার অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর তাঁর ওপর নেমে আসে ‘সিস্টেমিক টর্চার’। সাবেক সহকর্মীরা জানান, আইটি ও এইচআর বিভাগের মাধ্যমে তাঁর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। ডেস্কের সামনে ক্যামেরা বসানো হয় এবং ব্যক্তিগত ফোনে নজরদারির অভিযোগ ওঠে। ভালো পারফরম্যান্স থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ব্রাঞ্চে বদলি করা হয়।।মৃত্যুর আগে এই বিভিশিখাময় ঘটনার বর্ননা দিতে গিয়ে আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিতে পারার আক্ষেপ করে যান তিনি।
তামান্না আরো জানান যে, মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে তিনি তার আত্মীয় তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা এইচ টি ইমামের রেফারেন্স ব্যবহার করেলেও, সিস্টেমেটিক ভাবে উক্ত সিন্ডিকেটের প্রভাব চলমান থাকে। তিনি জানান যে, এইচ টি ইমাম উক্ত বিষয়ে নিজেকে জড়াতে চাইলে, তিনি সমাজের কথা চিন্তা করে তাকে নিষেধ করেছিলেন।
এদিকে নির্যাতন সইতে না পেরে তামান্না কাদির মেঘনা ব্যাংকে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আলী রেজা ইফতেখার সেখানেও তার পিছু ছাড়েননি। তিনি মেঘনা ব্যাংকের তৎকালীন এমডি কে ফোন করে তামান্নাকে ‘চরিত্রহীন’ আখ্যা দিয়ে চাকরি না দেওয়ার জন্য চাপ দেন। যদিও মেঘনা ব্যাংকের তৎকালীন এমডি সেই মিথ্যাচারে কান না দিয়ে তামান্নাকে সাহস যুগিয়েছিলেন।
তামান্না কাদিরের অভিযোগ যে একক নয়, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ব্যাংকের আইন বিভাগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহনা মূলকুএর বক্তব্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি নিয়োগ ও কর্মপরিবেশে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন প্রকাশ্যেই। ফাঁস করেছেন মেসেঞ্জারে কথোপকথনের স্ক্রিনশটও। তাঁর দাবি, নৈতিক অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁর ব্যাংকিং ক্যারিয়ার কার্যত শেষ হয়ে যায়।
শাহনা মূলক অভিযোগ করেন যে, নিয়োগ বোর্ডে বসে তাকে চরম যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ব্যাংকের সাবেক রিটেইল হেড নাজিম আনোয়ার চৌধুরী নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের মেধার চেয়ে শারীরিক গঠনকে প্রাধান্য দিতেন এবং তাদের ‘শিকার’ করতেন। এমডির শ্যালক বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিচয়দানকারী নিউটন তাকে মাদকের ছবি এবং অশ্লীল মেসেজ পাঠাতেন এবং এই ব্যক্তি শারমিন আতিকের সাথে এমডি আলী রেজার গভীর সখ্যের বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেছেন।
ইফতেখার সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেহাই পাননি পুরুষ সহকর্মীরাও। ব্যাংকের যেসব জ্যেষ্ঠ পুরুষ কর্মকর্তা তামান্নার মেধার মূল্যায়ন করতেন এবং তাকে এই অন্যায়ের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, তাদের জীবনও দুর্বিষহ করে তোলা হয়, তাদেরি একজনের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান যে, তামান্না কে সাপোর্ট করার খেসারতে তাকে সহ অনেক কেই ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং অন্য কোনো ব্যাংকে যাতে চাকরি না পান, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেন আলী রেজা ইফতেখার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন সাবেক কর্মকর্তা জানান যে, তামান্না কাদিরকে আমরা যারা সহযোগীতা করেছিলাম তাদেরকে প্রথমে একে একে প্রায়োরোটি ব্যাংকিং থেকে বিভিন্ন ব্রাঞ্চে বিনা অজুহাতে বদলি এবং সর্বশেষ খড়গ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চাকুরিচূত্য করার ব্যবস্থা করা হয়। এই কর্মকর্তা আরো জানান, তিনি যেন অন্য ব্যাংকে চাকুরী না পান আলী রেজা ইফতেখার সেভাবেই অন্য ব্যাংকে তদবির করেন। যার ফলে তিনি ব্যাংক সেক্টরের বাহিরে ক্যারিয়ার গড়তে বাধ্য হন।
একই অভিযোগ পাওয়া যায় ব্যারিস্টার শাহনা মূলক এর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে। তিনি অভিযোগ করেন যে, নৈতিকতাজনিত কারণে আমি আমার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং তখন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে যেন আমি কোথাও কোনো সুপারিশ না পাই। তারা আমাকে দীর্ঘ দিন ধরে হয়রানি করছে, যেহেতু আমি সেখানকার আইনজীবী ছিলাম, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি অনেক বেশি জানি এবং সেখানে আসলে কী ঘটে তার প্রচুর তথ্য, ছবি ও ভিডিও আমার কাছে আছে।
তামান্না কাদির আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগে দেওয়া বক্তব্য এবং অন্যান্য ভুক্তভোগীর অভিযোগ ইবিএলের ভেতরে নারীদের কর্মপরিবেশ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন রেখে গেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া ব্যাংকটির ভেতরের এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে না।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত