মিম আক্তার॥
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ‘পুষ্পধারা প্রপার্টিজ লিমিটেড’-এর প্রতারণা নিয়ে প্রিন্ট ও মাল্টিমিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এ প্রকল্পের অনিয়ম ও জমি দখলের চিত্র উঠে আসার পর মুখ খুলতে শুরু করেছে পুষ্পধারার প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা। এবার সামনে এসেছে বিতর্কিত এই হাউজিং কোম্পানিটি কর্তৃক একাধিক গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার ভয়াবহ অভিযোগ। গ্রাহকরা জানিয়েছেন টাকা নেওয়ার পর অন্যের প্লট তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তিনি মুখ খুললে দেওয়া হচ্ছে হুমকি।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, আকর্ষণীয় প্রেজেন্টেশন ও ‘নিশ্চিত প্লট’ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করেছেন। পরে দেখা গেছে, যে জমি প্লট হিসেবে দেখানো হয়েছে সেটি অন্যের মালিকানাধীন অথবা প্রকল্পের আওতাভুক্তই নয়।
সূত্র জানায়, একই প্লট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। কাগজপত্রে নাম থাকলেও বাস্তবে গিয়ে গ্রাহকরা জমির দখল পাননি। বরং একই জায়গা নিয়ে একাধিক ক্রেতার মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে অনেকে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সুনিয়া আক্তারসহ প্রতিষ্ঠানটির বিপণন টিম নির্দিষ্ট কিছু জমিকে ‘ভিআইপি প্লট’ বা ‘লিমিটেড অফার’ হিসেবে দেখিয়ে দ্রুত বুকিং নিতে চাপ সৃষ্টি করতেন। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে গ্রাহকদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকদের দেওয়া টাকা সরাসরি কোম্পানির অফিসিয়াল হিসাবে না নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লেনদেনের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে পরে অর্থ ফেরত চাইতে গেলে নানা অজুহাতে টালবাহানা করা হয়। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, প্রথমে নির্দিষ্ট লোকেশন দেখিয়ে প্লট বিক্রি করা হলেও পরে অন্য মৌজায় বিকল্প জমি দেখানো হয়। অনেকে টাকা ফেরত চাইলে হুমকি-ধামকি কিংবা সময়ক্ষেপণের অভিযোগও করেছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকল্প এলাকায় পর্যাপ্ত জমি না থাকলেও কাগজে-কলমে হাজার হাজার প্লট দেখিয়ে বিক্রির ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। এতে করে নতুন গ্রাহকের টাকা দিয়ে পুরনো গ্রাহকদের আংশিক সমন্বয় করার মতো পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব কর্মকাণ্ডে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে গ্রাহক সংগ্রহ, কাগজপত্র তৈরি এবং জমি দেখানো, সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
শ্রীনগরের কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক জানান, তারা জীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। অনেকেই জমি না পেয়ে কিংবা টাকা ফেরত না পেয়ে মানসিক ও আর্থিক সংকটে ভুগছেন। উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কাছে এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি কল রিসিভ করেননি । পুষ্পধারা হাউজিংয়ের ভাইস চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অবৈধ অর্থ লেনদেন, দালালচক্র পরিচালনা ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছে রাজধানীর মীর হাজারিবাগ এলাকার বাসিন্দা মাকসুদ আলম।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, মালিবাগে অবস্থিত পুষ্পধারা হাউজিংয়ের করপোরেট অফিসকে কেন্দ্র করে মনিরুজ্জামানের প্রত্যক্ষ মদদে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্র গ্রাহকদের “বিশেষ সুবিধায়” ও “নিশ্চিত প্লট” দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব অর্থ অফিসিয়াল হিসাবের বাইরে নেওয়া হয় এবং গ্রাহকদের কোনো বৈধ রশিদ দেওয়া হয় না। পরে গ্রাহকদের এমন জমি দেখানো হয়, যা প্রকল্পভুক্ত নয় কিংবা অন্যের মালিকানাধীন বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বরাত দিয়ে দুদকে বলা হয়েছে, টাকা ফেরত চাইলে সময়ক্ষেপণ, ভয়ভীতি ও বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতে অনেক গ্রাহক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।দুদকে দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, মালিবাগ অফিসের ভেতরে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে, যা সরাসরি মনিরুজ্জামানের প্রভাব ও আশ্রয়ে পরিচালিত হচ্ছে। গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের জন্য বিলাসবহুল অফিস, চটকদার প্রচারণা এবং উচ্চপর্যায়ের পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত বিপুল পরিমাণ অর্থের হিসাব, উৎস ও ব্যবহার নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, এই অর্থের একটি অংশ ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং আর্থিক লেনদেনের বড় অংশ গোপনে পরিচালিত হয়েছে।দুদকে দেওয়া আবেদনে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে জরুরি অনুসন্ধান শুরু, তার ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তদন্ত, সম্পদের উৎস যাচাই এবং মালিবাগ অফিসকেন্দ্রিক দালালচক্রের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া তদন্ত চলাকালে প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে মনিরুজ্জামানের কার্যক্রম নজরদারিতে আনা এবং প্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধও করা হয়েছে। আবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী মামলা দায়েরসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার, লেনদেনের স্বচ্ছ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত