ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজারঃ
সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লোকজ গান, নাচ ও আকর্ষনীয় মেলার মধ্য দিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সম্পন্ন হলো দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল’। দেশের পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড’র উদ্যোগে ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের ফুলছড়া চা বাগান মাঠের সবুজ প্রান্তরে গত রবিবার (২১ জুন) রাত ১০টার দিকে সমাপ্ত হয় এবারের মিলনমেলা।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালির মেলবন্ধনের তিন দিনের বর্ণিল এই উৎসবে শ্রীমঙ্গল ও সংলগ্ন এলাকার সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ২৭টি সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নিয়েছেন। তিন দিনই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ শিল্পীরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নাচে-গানে মাতিয়ে রাখেন অনুষ্ঠানমঞ্চ। মৌলভীবাজার জেরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত দর্শক-স্রোতারা তন্ময় হয়ে ২৭টি সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবেশনা তন্ময় হয়ে উপভোগ করেন।
এর আগে গত শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এমপি। অনুষ্ঠানে গেস্ট অফ অনার হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এমপি, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, ট্যুরিস্ট পুলিশ বাংলাদেশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান, সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি ড. মো. জিল্লুর রহমান, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম, ফিনলে টি কোম্পানির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা তাসিন আহমেদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুর রউফ।
তিন দিনব্যাপী এবারের হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২ এর বর্ণিল উৎসবে ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তথা খাসিয়া, গারো, মনিপুরি, ত্রিপুরা, সবর, খাড়িয়া, রিকিয়াসন, বাড়াইক, কন্দ, রাজবল্বব, ভূইয়া, সাঁওতাল, ওরাও, লোহার, মুন্ডা, কুর্মী, ভুমিজ, বুনারাজি, গঞ্জ, মৃধা, তেলেগু, গৌড় সমাজ, রবিদাস, পাইনকা, কৌরি/ভুজপুরী, কালিন্দি, কড়াসহ শ্রীমঙ্গল ও সংলগ্ন এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অংশগ্রহণ করে। উৎসবে সবর জনগোষ্ঠীর সবরী নৃত্য, ভজন নৃত্য ও বোনাকাড়ো নৃত্য, খাড়িয়াদের ঝুমুর ও খাড়িয়া নৃত্য, রিকিয়াসনদের মুশোরি নৃত্য, ঝুমুর নৃত্য ও লাঠি নৃত্য, বাড়াইকদের ডমকচ নৃত্য, ডীনসারি নৃত্য ও ঝুমুর নৃত্য, কন্দদের কুই নৃত্য, রাজবল্ববদের কিরংগ লগইলু নৃত্য ও দহি আনিচিরে নৃত্য, ভূইয়াদের ভূইয়া গীত, সাঁওতালদের লাগড়ে নৃত্য ও দং নৃত্য, ওরাওদের ওরাও নৃত্য, মুন্ডাদের মুন্ডারি নৃত্য ও ঝুমুর নৃত্য, কুর্মীদের কুরমালি নৃত্য, ভুমিজদের ঝুমুর নৃত্য, বুনারাজিদের অলেখ্য ভোজন, সম্বল পুরিয়া নৃত্য ও মংলা নৃত্য, লোহারদের ভুজপুরি রামায়ন কীর্তন, গজ্জুদের রঙ ঝুমুর ও আসাম নৃত্য, তেলেগুদের গানতি বাজনি (ডাল তেলু) ও সেলতেলু (কাঠি নৃত্য), কড়াদের ঝুমুর নৃত্য ও ধামসি কড়া নৃত্য, খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক ডিয়া কেরছা ও মালা পরিধানের মাধ্যমে নাচ ও গান, তীর ধনুক প্রতিযোগিতা, সীয়াট বাটুর (গুলতি দিয়ে খেলা), কিউ থেনেং (তৈলাক্ত বাঁশে উঠার প্রতিযোগিতা), গৌড়দের লাঠি নৃত্য, কার্মা নাচ ও দাদারিয়া গীত, মৃধাদের লাঠি নৃত্য ও ঝুমুর নৃত্য, কৈরী/ভুজপুরিদের ভজন সংগীত, লাচারি ও পুরবী সংগীত, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কাথারক নৃত্য, বৈসু নৃত্য, জুম নৃত্য, মামিটা নৃত্য ও আতারঙ চাকহাই নৃত্য, গারো জনগোষ্ঠীর মান্দি নৃত্য, গারো জুম চাষা নৃত্য, ওয়ানগালা উৎসব প্রদর্শন, ও সেরেনজিং নৃত্য (প্রেম কাহিনীর গান), মনিপুরি জনগোষ্ঠী রাস লীলা নৃত্য, পুং চলোম নৃত্য (ঢোল নৃত্য) এবং রাধা কৃষ্ণ নৃত্য, রবিদাসদের রাজধারী নৃত্য ও পুরবী বিরহা গান, পাইনকাদের কারমা গীত ও দাদারিয়া গীত, ভূইয়াদের ভূইয়া গীত এবং কালিন্দিদের কালিন্দি ঝুমুর নৃত্য প্রদর্শিত হয়।
এছাড়াও খাসিয়া জনগোষ্ঠীদের পান নিয়ে লাইভ পরিবেশনা, ত্রিপুরাদের কোমর তাত, মনিপুরিদের লাইভতাত, চা প্রদর্শনী, কুমারদের লাইভ মাটির জিনিসপত্র প্রস্তুত এবং সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল নৃত্যও পরিবেশন করা হবে। খাসিয়া জনগোষ্ঠীদের পান নিয়ে লাইভ পরিবেশনা, মনিপুরিদের লাইভ তাত, হোমস্টে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের কাঠ ও বাঁশের সামগ্রী লাইভ প্রস্তুত, কুমারদের লাইভ মাটির জিনিসপত্র প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী স্টলের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত পণ্য, খাবার, জীবনাচার, পোষাক, ব্যবহৃত গহনা, শিকারে ব্যবহৃত তীর ধনুক ইত্যাদি প্রদর্শন ও বিক্রয় করেছেন। রবিবার (২১ জুন) রাত ১০টার দিকে এবারের বর্ণিল আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) সালেহা বিনতে সিরাজ। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১০ থেকে ১২ জানুয়ারি মৌলভীবাজারে শ্রীমঙ্গল উপজেলার কাকিয়া ছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ২৬টি সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দেশে প্রথমবারের মতো হারমোনি ফেস্টিভ্যাল।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত