স্টাফ রিপোর্টারঃ
ঢাকা থেকে ট্রেনে করে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন কিবরিয়া। কুমিল্লা রেলস্টেশনে নেমে যখন তিনি রিকশা নিয়ে বাড়ির পথ ধরেন, তখন রাত প্রায় ১টা। মাঝপথে হঠাৎ ২০-২৫ জন লোক তাঁর রিকশাটি ঘিরে ধরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে টেনেহিঁচড়ে রিকশা থেকে নামিয়ে ফেলা হয়। কিবরিয়া তাঁদের চিনতে পেরেছিলেন-তাঁরা সবাই ছিলেন কুমিল্লার তৎকালীন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য (এমপি) জাহেরের অনুসারী।
রিকশা থেকে নামিয়েই কিবরিয়ার মাথায় কালো টুপি পরিয়ে জোরপূর্বক একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। এরপর গাড়িটি সরাসরি চলে যায় এমপি জাহেরের বাসভবনে। এমপির বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় এলোপাতাড়ি মারধর। এমপি জাহের নিজে কিবরিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন, তুই ছাত্রদল করিস কেন? বিএনপি করিস কেন? তোর সাথে কার কার যোগাযোগ আছে? কিবরিয়া আকুতি করে বলেছিলেন, আমি তো ভুল কিছু করছি না, কারও কোনো ক্ষতিও করিনি। আমার দোষটা কী? কিন্তু জাহের কোনো কথা না শুনেই নির্দেশ দেন নির্যাতনের। তিনি বলেন, তুই ছাত্র রাজনীতি করিস, বিএনপি করিস-এটাই তোর বড় দোষ। এরপর মোটা লাঠি দিয়ে অনবরত পেটানো হয় কিবরিয়াকে। এখানেই ক্ষান্ত হয়নি নির্যাতনকারীরা; তাঁর পুরো শরীরে দেওয়া হয় ইলেকট্রিক শক। তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি, মুখ দিয়ে কেবল গোঙানির আওয়াজ বের হচ্ছিল। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল, বারবার একটু পানি চেয়েছিলেন, কিন্তু এক ফোঁটা পানিও তাঁর মুখে দেওয়া হয়নি। রাতভর চলে এই অমানুষিক ও বর্বর নির্যাতন। কিবরিয়া ভেবেছিলেন সকাল হলে হয়তো এই নরককুণ্ড থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু সকাল হতেই নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগ নেতা অপি একটি ধারালো ছুরি নিয়ে কিবরিয়ার চোখ দুটি উপড়ে ফেলতে উদ্যত হয়।
প্রথম চোখটি উপড়ে ফেলার সময় কিবরিয়া হাতজোড় করে কেঁদে কেঁদে মিনতি করেছিলেন, দরকার হলে আমার একটা হাত কেটে ফেলো, তাও চোখ দুটো নষ্ট কোরো না। চোখ দুটো আমাকে ভিক্ষা দাও। কিন্তু সেই আকুতি হন্তারকদের মন গলাতে পারেনি। উল্টো চড়-থাপ্পড় মারতে মারতে তারা বলে, তোর চোখ দুইটাই উপড়াব, যাতে মরা মানুষের মতো বেঁচে থাকতে হয়। কয়েকজন শক্ত করে চেপে ধরে এবং ধারালো ছুরি দিয়ে কিবরিয়ার দুটি চোখই উপড়ে ফেলা হয়। চোখ উপড়ানোর সেই তীব্র ও নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কিবরিয়া গোঙানির সুরে চিৎকার করতে থাকেন। সেই চিৎকার আশেপাশে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ছুটে আসে। বেগতিক দেখে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা কিবরিয়াকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা গুরুতর আহত কিবরিয়াকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত তাঁকে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও পিছু ছাড়েনি এমপি জাহেরের নিষ্ঠুরতা। চিকিৎসকেরা যাতে কিবরিয়াকে ভালো চিকিৎসা না দেন, সেজন্য হাসপাতালে গিয়ে হুমকি দেন এমপি। এরপর পুলিশ ডেকে দুই চোখ হারানো এই অসহায় তরুণের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলা দিয়ে হাসপাতাল থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করানো হয়। এখানেই শেষ নয়, এমপি জাহের কিবরিয়ার মাকে নানাভাবে হুমকি দিতে থাকেন। পরবর্তীতে যাতে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা মামলা করা না যায়, সেজন্য পুলিশ কিবরিয়ার মায়ের কাছ থেকে জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর (সই) করিয়ে নেয়। এভাবেই দুটি চোখ হারিয়ে ২০১৬ সাল থেকে চিরতরে অন্ধত্ব বরণ করে আছেন একসময়ের মেধাবী ছাত্র কিবরিয়া। অথচ চবিতে পড়ার সময় স্টুডেন্ট-বান্ধব নানা সামাজিক ও পরোপকারী কাজের জন্য তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন। এর আগে তাঁর বড় ভাইকেও ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়েছিল এই এমপির লোকেরা।
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তীব্র ভয় আর আতঙ্কে চুপ করে থাকতে হয়েছিল কিবরিয়ার পরিবারকে। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, গত জুন মাসে (২০২৬) এই নৃশংস ঘটনার সাথে জড়িত সবার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন কিবরিয়া। আদালত প্রাঙ্গণে মামলা করতে এসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। অশ্রুসিক্ত চোখে বলছিলেন, মানুষ মারা যাওয়ার পর অন্ধকার কবরে চলে যায়, কিন্তু আমি বেঁচে থেকেও পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার দেখি। আপনারা তো আমার চোখ দুটো ফেরত দিতে পারবেন না, কিন্তু যারা আমার এই দশা করেছে, তাদের বিচারটুকু শুধু করে যান। কিবরিয়ার এই নির্মম ট্র্যাজেডি আওয়ামী আমলের সামগ্রিক বর্বরতার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভুক্তভোগীদের মতে, স্বাধীনতার পর থেকেই এই দলটির ইতিহাস রক্তরঞ্জিত। জাসদ কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, শাপলা চত্বরের ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যের হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ছাত্র-জনতার ওপর চালানো গণহত্যা-সবই এক সূত্রে গাঁথা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে ৭,৬৯২ জনকে এবং অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
অথচ সাধারণ মানুষের ওপর এমন ভয়াবহ নৃশংসতা চালানো এই রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আজও ছাত্রলীগ-যুবলীগকে মিছিল ও শোডাউন দিতে দেখা যায়। এত রক্তের দাগ হাতে লেগে থাকার পরও তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা অনুতপ্ততা নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমানের কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতাও এখন আওয়ামী লীগের প্রতি একধরনের সহানুভূতি দেখাচ্ছেন এবং তাদের নিষিদ্ধ করার দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সেই সহানুভূতিশীল নেতাদের প্রতি প্রশ্ন-আপনারা কি একবারের জন্যও কিবরিয়ার উপড়ে ফেলা চোখ দুটির দিকে তাকিয়েছেন? দেখতে পেয়েছেন সেখানে কতটা নৃশংসতা আর বর্বরতা লুকিয়ে আছে? মাস্টার্সের ছাত্র কিবরিয়ার স্বপ্ন ছিল স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা (পিএইচডি) সম্পন্ন করবেন। দেশে ফিরে দেশের জন্য কিছু করবেন, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু আজ সেসব স্বপ্ন শুধুই অতীত। কিবরিয়া কিংবা আবরার ফাহাদের মতো অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণের স্বপ্নকে চিরতরে পিষে মেরেছে এই রাজনৈতিক দল। কিবরিয়া এখন রাতে ঘুমাতেও ভয় পান। ঘুমালেই স্বপ্নে বারবার ভেসে ওঠে তাঁর সেই হারিয়ে যাওয়া চোখ দুটির কথা, তাঁর সেই হাসিখুশি দিনগুলোর কথা। দেশের মানুষ হয়তো সময়ের নিয়মে আওয়ামী লীগের এই নৃশংসতার কথা ভুলে যাবে, কিন্তু কিবরিয়ার মতো হাজারো ভুক্তভোগী পরিবার এই ক্ষত সারাজীবনেও ভুলতে পারবে না। আমাদের দিন হয়তো ভালোই কেটে যাবে, কিন্তু প্রতিবার স্বপ্নে অন্ধকার দেখার সময় কিবরিয়ার মনে পড়বে-তাঁরও একটা সুন্দর স্বপ্ন ছিল, একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ ছিল।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত