ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ
হুল হুল হুলে হুল, ত্রিশে জুন হুলে হুল.. এই ঐতিহাসিক স্লোগানকে সামনে রেখে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় এবং সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব ও ফুলমনি, ঝানুর স্মরণে ১৭১তম মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ (হুল দিবস) স্মরণে সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আয়োজনে দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের ভানুগাছ রোডস্থ অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিলেট বিভাগের সকল সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে অনুষ্ঠানস্থলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও অনুষ্ঠানস্থলের সামনে স্থাপিত বিদ্রোহী সিধু ও কানুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদ নেতৃবৃন্দ। পরে এক র্যালি শহর প্রদক্ষিণ করে। সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হয় আলোচনা সভা। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রবীন ব্যক্তিত্ব সুজিত সাঁওতালের সভাপতিত্বে এবং দুলাল সাঁওতাল ও স্বপন সাঁওতালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয় বনিক, বাংলাদেশ চা শ্রমিক আদিবাসী ফ্রন্টের সভাপতি পরিমল সিং বাড়াইক, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা কেন্ত্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি বঙ্গকবি লুৎফুর রহমান, হাজী আব্দুল গফুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক প্রদীপ সাঁওতাল এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিকুল চক্রবর্তী। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুমন সাঁওতাল, জবা সাঁওতাল, রনজিত সাঁওতাল, সমর সাঁওতাল, দয়ামনি সাঁওতাল, নরেশ সাঁওতাল, প্রদীপ সাঁওতাল, কমল সাঁওতাল, রাঙাচরণ সাঁওতাল, শ্যামল সাঁওতাল, বিষ্ণু সাঁওতাল প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে দিবসের পটভূমি সম্পর্কে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর লোকজন বলেন, ১৯ শতকে ব্রিটিশ ভারতে সংঘটিত ঔপনিবেশিক ও জমিদারি শাসন-বিরোধী আন্দোলনে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী নেতৃত্ব দিয়েছিলো। এর সূচনা হয় ১৮৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায়। ইংরেজ আমলে স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজদের রাজস্ব ও কৃষি নীতির বিরুদ্ধে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় চার ভাই- সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব এবং বোন জানু ও ফুল। ১৭৯৩ সালে বড়লাট (গভর্নর-জেনারেল) লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাঁদের প্রাচীন স্থানান্তর চাষ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। তাই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের আগে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা বিদ্রোহ গড়ে তোলে। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তা শেষ হয়। সাঁওতালরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করায় ইংরেজ বাহিনীর আধুনিক বন্দুক ও কামানের কাছে টিকতে পারেনি। এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা মারা গিয়েছিলো। যুদ্ধে পর্যায়ক্রমে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব (সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান নেতাসমূহ) নিহত হলে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষ হয় ও বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে। সাঁওতাল বিদ্রোহের পর ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত করে। বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ভাগলপুর ও বীরভূমের কিছু অংশ নিয়ে ৫ হাজার ৫০০ বর্গ মাইল জুড়ে এবং প্রথমে দেওঘর ও পরে দুমকায় প্রধান কার্যালয় নির্দিষ্ট করে সাঁওতাল পরগণা জেলা গঠিত হয়। এই পরগণাকে অনিয়ন্ত্রিত একটি জেলা ঘোষণা করা হয়। প্রথমে এই জেলার নাম হয় ডুমকা, যেটি পরবর্তীতে সাঁওতাল পরগনা নামে পরিচিত হয়। এখানে সাঁওতাল মানঝি্, পরানিক, পরগনা জেলার শাসন পরিচালনার জন্য দারোগা, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি কমকর্তা-কর্মচারী ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়। সাঁওতালদের বিচার সালিশ তাদের আইনে করার জন্য সরকার ক্ষমতা প্রদান করে। খাজনা, কর প্রভৃতি তাঁদের হাতে অর্পণ করা হয়। তাঁরা জেলা প্রশাসকে নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকে। ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেনান্সি এ্যাক্ট অনুযায়ী আদিবাসীরা তাদের জমি সরকারি অনুমতি ছাড়া বিক্রি করতে পারতো না। এই আইন এখনও পর্যন্ত কার্যকর আছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত