মো. জুয়েল হোসেন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর থেকেই সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের পর পৌর এলাকায় মাঠ গোছাতে শুরু করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা।তবে স্থানীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—পৌর নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা এবং একই সাথে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে কেন্দ্র করে দলের একাংশের বিতর্কিত ভূমিকা।
স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির একাধিক যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্ব মাঠে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম চারজন হেভিওয়েট প্রার্থী হলেন—কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু; জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক নূর কায়েম সবুজ; পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান জেলা যুগ্ম সম্পাদক মুন্সি জাহেদ আলম এবং সিরাজগঞ্জ নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ফয়সাল হাসান মাহমুদ।
উল্লিখিত চার নেতার মধ্যে প্রথম তিনজনই সাবেক তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন। এছাড়া ফয়সাল হাসান মাহমুদও পেশাগত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি নিয়ে দলের একটি বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ ও রাজপথের সক্রিয়তার কারণে এই চার নেতার যেকোনো একজনকে ঘিরেই মূলত ধানের শীষের সমর্থকরা স্বপ্ন দেখছেন।
তবে এই সুস্থ নির্বাচনী আলোচনার ভেতরেই নতুন এক কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছেন ১০নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী মো. আব্দুস সাত্তার। অভিযোগ উঠেছে, নিষিদ্ধ ও স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী দল আওয়ামী লীগের এই নেতার পক্ষ নিয়ে ছাত্রদল ও স্থানীয় বিএনপির একাংশ মাঠে নেমেছে। সমাজিক ও ‘মানবিক কাজের আড়ালে ওই আওয়ামী লীগ নেতার ইমেজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা স্থানীয় সাধারণ নেতাকর্মী ও জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি এই বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও এনটিভির জেলা প্রতিনিধি শরীফুল ইসলাম ইন্না। সাবেক এই ছাত্রনেতা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের করা ফেসবুক পোস্টটি এখন সিরাজগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
শরীফুল ইসলাম ইন্না তার পোস্টে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপিতে কি যোগ্য মেয়র প্রার্থী নাই? আছে। যারা আওয়ামী লীগ নেতাকে নিয়ে লাফালাফি করছেন তাদের বলব, দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন করবেন না... যে দলের নেতারা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিনা চিকিৎসায় হত্যার চেষ্টা করেছে, বিএনপির শত শত নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করেছে, সেই দলের নেতার অফিসে গিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করতে আপনাদের লজ্জা না লাগলেও ছাত্রদলের একজন সাবেক নেতা হিসেবে আমি লজ্জাবোধ করছি।
তিনি জুলাই আন্দোলনে সিরাজগঞ্জের ত্যাগ ও ক্ষয়ক্ষতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরও লেখেন, জুলাই আন্দোলনে সিরাজগঞ্জে বিএনপির তিন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। সয়দাবাদে যুবদল নেতা জবান আলীসহ দুই নেতাকে হত্যা করে লাশ রেললাইনের পাশে ফেলে রাখা হয়। জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য রুমানা মাহমুদ গুলিবিদ্ধ হন, মহিলা দলের নেত্রী মেরীসহ একাধিক নেতাকর্মীর চোখ অন্ধ করা হয়েছে—তাদের ভুলে গেছেন? সিরাজগঞ্জের মানুষ ফ্যাসিস্ট দলের কাউকে মেনে নেবে না।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু, নূর কায়েম সবুজ, মুন্সি জাহেদ আলম কিংবা ফয়সাল হাসান মাহমুদ—এই চারজনের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে কোনো ফ্যাসিবাদের সহযোগীকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। নেতাদের উচিত নিজেদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি দূর করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করা এবং দলের যোগ্য প্রার্থীদের নিয়ে মাঠে নামা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিরাজগঞ্জ পৌরবাসী স্বৈরাচারী ব্যবস্থার দোসরদের আর গ্রহণ করবে না। এই অবস্থায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব যদি তৃণমূলের এই ক্ষোভকে আমলে নিয়ে দ্রুত সাংগঠনিক পদক্ষেপ না নেয়, তবে তা আসন্ন পৌর নির্বাচনে দলের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সার্বিক বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পৌর নির্বাচনের সম্ভাব্য হেভিওয়েট প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভায় শক্ত অবস্থানে থাকা সম্ভাব্য প্রার্থী সাইদুর রহমান বাচ্চু এ বিষয়ে বলেন, সিরাজগঞ্জ বিএনপি সবসময় ত্যাগী ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করে। জুলাই বিপ্লবে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে আমরা কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেব না। আওয়ামী লীগের কোনো নেতার আড়ালে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ সিরাজগঞ্জের মাটিতে নেই। নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক নূর কায়েম সবুজ বলেন, কারো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দলের ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না। বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা অনেক নির্যাতন সহ্য করে আজ এই অবস্থানে এসেছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধুলিসাৎ করে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে হাত মেলানোর কোনো সুযোগ কোনো স্তরের নেতাকর্মীর নেই। দলের অভ্যন্তরে কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা সাংগঠনিক উপায়ে সমাধান করা হবে এবং আমরা সবাই শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত।
পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সম্পাদক মুন্সি জাহেদ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে আমি মনে করি, দলের আদর্শ ও শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানি করা যাবে না। সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির একাধিক যোগ্য নেতৃত্ব রয়েছে, দল যাকে মনোনয়ন দেবে আমরা তার পক্ষেই জানপ্রাণ দিয়ে খাটব। কোনো বহিরাগত বা ফ্যাসিবাদের সহযোগীর স্থান এখানে হবে না। সিরাজগঞ্জ নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ফয়সাল হাসান মাহমুদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ১০নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী মো. আব্দুস সাত্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, পৌর এলাকার সাধারণ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবিক কাজ করা কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, এটা কেবলই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে করছি। রাজনৈতিক মেরুকরণের সাথে আমার এই মানবিক উদ্যোগের কোনো সম্পর্ক নেই। কিছু মহল একে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত