শাহরিয়ার হাসান ফাহিম:
বাংলাদেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ড হাজার বছর ধরে কৃষিভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আজও দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে বাংলাদেশের কৃষি একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন, উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থার অস্থিরতা কৃষিকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথ্যের বিচ্ছিন্নতা ও কৃষকদের কাছে সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছাতে না পারার দীর্ঘদিনের সমস্যা। একজন কৃষক যখন ধানের চারা রোপণ করেন, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে- বৃষ্টি কবে হবে? কখন সেচ দিতে হবে? কখন সার প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে? কখন ফসল কাটলে ঝড় বা বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি সময়মতো পাওয়া না যায়, তাহলে একটি পুরো মৌসুমের শ্রম ও বিনিয়োগ কয়েক দিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এ বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি আর বিলাসিতা নয়; এটি এখন প্রয়োজন।
তথ্যভিত্তিক কৃষিই ভবিষ্যতের কৃষি: বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কৃষি এখন কেবল জমি, বীজ ও শ্রমের সমন্বয় নয়; এটি মূলত তথ্য, বিশ্লেষণ এবং পূর্বাভাসের বিজ্ঞান। স্যাটেলাইট তথ্য, আবহাওয়া মডেল, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকরা অনেক আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের নতুন যুগে প্রবেশ করেছেন। বাংলাদেশেও সেই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি দেশের কৃষকদের হাতে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়া যায়, তাহলে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং ঝুঁকি হ্রাস, অপচয় কমানো এবং আয় বৃদ্ধি-সবকিছুই সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে ‘Quantum Safe Bangladesh’ ধরনের একটি সমন্বিত ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্ম ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সম্ভাবনার নতুন ভাষা: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি। প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে বিট ব্যবহার করে এবং প্রতিটি বিট হয় ০ অথবা ১ অবস্থায় থাকে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে কিউবিট, যা একই সময়ে একাধিক অবস্থায় থাকার তাত্ত্বিক সক্ষমতা রাখে। এর ফলে জটিল সমস্যা সমাধান, বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং বহুমাত্রিক মডেলিংয়ের ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ভবিষ্যতে বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এখনও গবেষণা ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্যিক ও বৃহৎ পরিসরে এর ব্যবহার এখনো সীমিত এবং অনেক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। সুতরাং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে একটি হাইব্রিড মডেল-যেখানে প্রচলিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম-অনুপ্রাণিত অ্যালগরিদম একসঙ্গে ব্যবহার করা হবে।
টেনসর নেটওয়ার্ক ও কোয়ান্টাম-অনুপ্রাণিত বিশ্লেষণ: বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম অ্যালগরিদমকে প্রচলিত GPU-ভিত্তিক অবকাঠামোয় অনুকরণ বা সিমুলেশনের জন্য টেনসর নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এ প্রযুক্তি বিশাল পরিমাণ তথ্যের মধ্যে জটিল সম্পর্ক দ্রুত বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশের কৃষিতে এর সম্ভাব্য ব্যবহার হতে পারে-বন্যা ও অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস বিশ্লেষণ; ফসলভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি; মাটির গুণগত বৈশিষ্ট্যের বিশ্লেষণ; সেচ ব্যবস্থাপনার অপ্টিমাইজেশন; সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি; কীটপতঙ্গ ও রোগব্যাধির ঝুঁকি পূর্বাভাস এবং বাজারদর ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিশ্লেষণ।
কৃষকের হাতে প্রযুক্তির ভাষা: প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা প্রযুক্তির জটিলতায় নয়, বরং তার ব্যবহারযোগ্যতায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক এখনো সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। ফলে একটি কার্যকর ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্মের মূল শক্তি হতে হবে সহজলভ্যতা। সেজন্য তিনটি স্তরের সেবা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে- প্রথমত, সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য এসএমএস সতর্কবার্তা। দ্বিতীয়ত, ভয়েস কল বা আইভিআর সেবা, যাতে স্বল্পশিক্ষিত কৃষকরাও সহজে তথ্য গ্রহণ করতে পারেন। তৃতীয়ত, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ মোবাইল অ্যাপ, যেখানে আবহাওয়া, বাজারদর, রোগব্যাধি, সেচ এবং কৃষি পরামর্শ একসঙ্গে পাওয়া যাবে। একজন কৃষক যদি সকালে একটি বার্তা পান- ‘আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ধান কাটার উপযুক্ত সময় আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। তাহলে সেই একটি তথ্যই হয়তো তার পুরো মৌসুমের ফসল রক্ষা করতে পারে।
বন্যাপ্রবণ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ প্রয়োজন: বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বন্যাপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল আকস্মিক বন্যার শিকার হয়। বিশেষ করে হাওর অঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় কৃষকরা ধান কাটার কয়েক দিন আগেই বন্যার পানিতে সব হারিয়ে ফেলেন। যদি আগাম ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা চালু করা যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তথ্যনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশেও উন্নত পূর্বাভাস, সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদন ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শতকরা হারে উৎপাদন বা আয় বৃদ্ধির দাবি করার আগে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা, পাইলট প্রকল্প এবং স্বাধীন মূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ কৃষি উৎপাদন আবহাওয়া, মাটি, বাজার, বীজ এবং ব্যবস্থাপনার মতো বহু উপাদানের ওপর নির্ভরশীল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কৃষি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যাংকিং এবং শিল্প উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। কৃষিও এর বাইরে নয়। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ, রোগ শনাক্তকরণ, ফলনের পূর্বাভাস এবং স্বয়ংক্রিয় পরামর্শ প্রদানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পরিপক্ব হলে এআই-এর সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
তথ্যই হবে নতুন সার: একসময় কৃষিতে বিপ্লব ঘটেছিল উন্নত বীজের মাধ্যমে। পরে সেচ ও যান্ত্রিকীকরণ নতুন পরিবর্তন নিয়ে আসে। আগামী দশকের কৃষি বিপ্লবের মূল শক্তি হতে পারে তথ্য। যে কৃষকের হাতে সঠিক তথ্য থাকবে, তিনি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবেন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন: এ ধরনের বৃহৎ প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তি কোম্পানির সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্ব এ ধরনের প্রকল্পকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দিয়েছে বা অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে-এমন দাবি করার ক্ষেত্রে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও যাচাইকৃত তথ্যের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন।
নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ: প্রযুক্তি কখনো একা সফল হয় না। এর জন্য প্রয়োজন-তথ্য অবকাঠামো; কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা; দক্ষ মানবসম্পদ; সাইবার নিরাপত্তা; তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা; স্থানীয় ভাষাভিত্তিক সেবা; দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নীতি। বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ বাংলাদেশ একসময় খাদ্য ঘাটতির দেশ ছিল। আজ আমরা খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত স্মার্ট কৃষি, টেকসই কৃষি এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি। সেখানে কোয়ান্টাম-অনুপ্রাণিত বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতের কৃষি কেমন হবে: সম্ভবত আগামী দিনের কৃষক মাঠে যাওয়ার আগে মোবাইলে দেখে নেবেন- আজ মাটির আর্দ্রতা কত? সেচের প্রয়োজন আছে কি? পরবর্তী সাত দিনের আবহাওয়া কেমন? কোন রোগের ঝুঁকি রয়েছে? কোন বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাবে? এই তথ্যগুলোই কৃষকের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার বিস্ময়কর দিগন্ত। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যবিজ্ঞানের সমন্বয়ে আগামী দিনের কৃষি আরও দক্ষ, আরও টেকসই এবং আরও লাভজনক হতে পারে। হয়তো আগামী কয়েক দশকে আমরা এমন এক বাংলাদেশ দেখব, যেখানে একজন কৃষক শুধু জমির দিকে তাকিয়ে নয়, বরং তথ্যের দিকে তাকিয়েও সিদ্ধান্ত নেবেন। আর সেই দিনই সত্যিকার অর্থে শুরু হবে বাংলাদেশের কৃষির নতুন যুগ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত