স্পোর্টস ডেস্কঃ
ইউরোপের সেরা গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন শু’ আবারও জিততে যাচ্ছেন হ্যারি কেইন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় দুর্দান্ত গোল করার স্বীকৃতি হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু উঠতে যাচ্ছে ইংলিশ স্ট্রাইকারের হাতে। আগামী ১৯ আগস্ট আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় অবস্থিত বায়ার্ন মিউনিখ মিউজিয়ামে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে মর্যাদাপূর্ণ এই ট্রফি।
এর আগে, ২০২৪ সালে প্রথমবার গোল্ডেন শু জিতেছিলেন কেইন। এবারও ৩৬ গোল করে বুন্দেসলিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। মজার ব্যাপার, প্রথমবার গোল্ডেন শু জয়ের মৌসুমেও বুন্দেসলিগায় তার গোলসংখ্যা ছিল ৩৬। অর্থাৎ দুইবারই একই সংখ্যক গোল করে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি পেলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।
দ্বিতীয়বার গোল্ডেন শু জয়ের মাধ্যমে ইউরোপের কিংবদন্তি গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করছেন কেইন। তার চেয়ে বেশি বার এই পুরস্কার জিতেছেন কেবল লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।
২০২৫-২৬ মৌসুমটি কেইনের জন্য ছিল রেকর্ড ও সাফল্যে ভরা। বুন্দেসলিগায় টানা তৃতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতার পাশাপাশি দলকে একাধিক শিরোপা জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বায়ার্নের হয়ে লিগ শিরোপার পাশাপাশি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সুপারকাপ ও ডিএফবি কাপ জিতেছেন এই ইংলিশ তারকা। ডিএফবি কাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে দলকে শিরোপা এনে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতাটির সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিতেছেন তিনি।
ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে পুরো মৌসুমে কেইনের পরিসংখ্যান আরও চমকপ্রদ। ৬৫টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে করেছেন ৭৩ গোল, সঙ্গে সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও আটটি গোল। এক মৌসুমে ৭৩ গোল করে একবিংশ শতাব্দীতে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন তিনি। তার সামনে রয়েছেন শুধু লিওনেল মেসি, যিনি ২০১১-১২ মৌসুমে ৭৩টিরও বেশি গোল করেছিলেন।
কেইনের সাফল্য শুধু গোল করার দক্ষতায় সীমাবদ্ধ নয়। মাঠে জায়গা তৈরি করা, সতীর্থদের গোলের সুযোগ করে দেওয়া এবং আক্রমণের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। বায়ার্নের কর্মকর্তাদের মতে, তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্বের গুণই তাকে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে।
বায়ার্নের সভাপতি হারবার্ট হাইনারের মতে, কেইন ইতোমধ্যে ক্লাবটির কিংবদন্তি স্ট্রাইকারদের কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন। গের্ড মুলার ও কার্ল-হাইঞ্জ রুমেনিগের মতো কিংবদন্তিদের গোল করার ঐতিহ্য আধুনিক সময়ে কেইনই এগিয়ে নিচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।
ক্লাবটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়ান-ক্রিশ্চিয়ান দ্রিসেনও কেইনের প্রশংসা করেছেন। তার মতে, মাঠে নামলেই বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়ে নেন কেইন। তবে গোল ও রেকর্ডের পাশাপাশি দলের প্রতি তার দায়িত্ববোধ, সতীর্থদের জন্য ভাবনা এবং নেতৃত্বের গুণ তাকে আলাদা করে তুলেছে।
বায়ার্নের ক্রীড়া বিভাগের বোর্ড সদস্য ম্যাক্স এবার্লের চোখেও কেইনের বিশেষত্ব শুধু গোলসংখ্যায় নয়। তার টাইমিং, সতীর্থদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে জায়গা তৈরির ক্ষমতা দলকে বাড়তি সুবিধা দেয়। ফলে কেইনের গোলগুলো তার সামগ্রিক ফুটবল বুদ্ধিমত্তারই প্রতিফলন বলে মনে করেন এবার্ল।
চ্যাম্পিয়নস লিগেও গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিলেন কেইন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রতিযোগিতাটির সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করেন তিনি। বায়ার্নে যোগ দেওয়ার পর ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের কোনো একটি ক্লাবের হয়ে দ্রুততম ১০০ গোলের রেকর্ডও গড়েছেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার।
জাতীয় দলের হয়েও দুর্দান্ত ছিলেন কেইন। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব ও মূল টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলকে সাফল্য এনে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে এরই মধ্যে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া কেইন বিশ্বকাপের ইতিহাসেও অন্যতম সফল ব্রিটিশ গোলদাতা।
বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও কেইনের গোল করার ধারাবাহিকতা উল্লেখযোগ্য। ইউরোপের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় শেষ চারটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা বেশি। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পাশাপাশি কেইনই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ—দুই প্রতিযোগিতাতেই অন্তত ২০টি করে গোল করেছেন।
মাঠের বাইরেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় কেইন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘হ্যারি কেইন ফাউন্ডেশন’ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার ফাউন্ডেশন।
দ্বিতীয়বার গোল্ডেন শু জিতে বায়ার্নের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ করবেন কেইন। এর আগে ক্লাবটির হয়ে এই পুরস্কার জিতেছেন কিংবদন্তি গের্ড মুলার ও রবার্ট লেভানদোভস্কি। মুলার ১৯৭০ ও ১৯৭২ সালে এবং লেভানদোভস্কি ২০২১ ও ২০২২ সালে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতেছিলেন। এবার তাদের পাশে নিজের নাম লেখাবেন কেইন।
ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শুর ইতিহাসেও রয়েছে বহু কিংবদন্তির নাম। লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, গের্ড মুলার, রবার্ট লেভানদোভস্কি, ফ্রান্সেসকো টট্টি, থিয়েরি অঁরি, রোনালদো নাজারিও, মার্কো ফন বাস্তেন, হ্রিস্তো স্তইচকভ ও ইউসেবিওর মতো তারকারা এর আগে এই পুরস্কার জিতেছেন।
বায়ার্নের সাবেক স্ট্রাইকার রয় ম্যাকায় ও লুকা টনিও এই তালিকায় থাকলেও তারা বাভারিয়ান ক্লাবটির হয়ে গোল্ডেন শু জেতেননি। ম্যাকায় দেপোর্তিভো লা করুনিয়ার হয়ে এবং টনি ফিওরেন্তিনার হয়ে এই পুরস্কার জিতেছিলেন।
সব মিলিয়ে ৩৬ গোলের বুন্দেসলিগা মৌসুম, ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৭৩ গোল, একাধিক দলীয় শিরোপা এবং একের পর এক ব্যক্তিগত রেকর্ড ২০২৫-২৬ মৌসুমটি কেইনের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মৌসুম হিসেবেই বিবেচিত হবে।
আগামী ১৯ আগস্ট বায়ার্ন মিউজিয়ামে যখন তার হাতে দ্বিতীয় গোল্ডেন শু তুলে দেওয়া হবে, সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত পুরস্কারই হবে না; ইউরোপীয় ফুটবলের সেরা গোলদাতাদের কাতারে হ্যারি কেইনের ক্রমবর্ধমান অবস্থানেরও বড় স্বীকৃতি হয়ে থাকবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত