নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও গণপূর্ত খাতের বড় বড় প্রজেক্ট থেকে কমিশন বা ‘কাটমানি’ নেওয়াকে যিনি অলিখিত নিয়মে পরিণত করেছেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তিনি পরিচিত ‘মিস্টার ৫%’ নামে। তিনি আর কেউ নন—গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়ের । গোপালগঞ্জ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রংপুর, কুমিল্লা হয়ে ঢাকা—চাকরিজীবনের যেখানেই তার পোস্টিং হয়েছে, সেখানেই জড়িয়েছেন নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মে। ঠিকাদারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন শত কোটি টাকার সম্পদ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার এই দুর্নীতির মহোৎসবের চাঞ্চল্যকর চিত্র।
প্রবেশদ্বার: ছাত্রলীগ কোটা ও ‘গোপালগঞ্জ কানেকশন’:
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরিজীবনের শুরু থেকেই দাপট দেখিয়েছেন প্রকৌশলী আবুল খায়ের । তৎকালীন সচিব শহীদুল্লাহর বিশেষ সুপারিশে ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ে তিনি গোপালগঞ্জ জোনে প্রভাবশালী পোস্টিং বাগিয়ে নেন। সেখানে থাকাকালীন ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম এবং তার পরিবারের সদস্যদের সাথে তার গভীর ‘দহরম-মহরম’ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে পুঁজি করে পরবর্তীতে তিনি অন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন।
চট্টগ্রাম জোনে ৩% কাটমানি ও পিসি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ:
চট্টগ্রাম জোনে থাকাকালীন প্রকৌশলী আবুল খায়ের দুর্নীতি ভিন্ন মাত্রা পায়। তিনি সেখানে প্রজেক্টের প্রতিটি কাজে ৩% করে কমিশন বা কাটমানি নেওয়া বাধ্যতামূলকমূলক করেন। সে সময় প্রচলিত ‘পিসি টেন্ডার’ (পার্সেন্টেজ শেয়ারিং টেন্ডার) ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তিনি একাই কামিয়েছেন ১০০ কোটি টাকা। কোনো ঠিকাদার কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার বিল আটকে দেওয়া বা ব্ল্যাকলিস্ট করার হুমকি দেওয়া হতো। এমনকি এক্সইন এইচডি এস (XIN, HDS) সহ বড় বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, সাধারণ ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মকর্তাদের সর্বদা নিজস্ব ক্ষমতার দাপটে দাবিয়ে রাখতেন তিনি।
কুমিল্লার এমপির তোপের মুখে অপসারণ:
চট্টগ্রামের পর কুমিল্লায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়েন খায়রুজ্জামান। কুমিল্লার তৎকালীন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সাথে টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে একপর্যায়ে এমপি বাহারের তীব্র আপত্তির মুখে তাকে কুমিল্লা জোন থেকে আকস্মিক সরিয়ে দেওয়া হয়।
রংপুর জোনে দুর্নীতি ও ৭১ টিভিতে লাইভ সাক্ষাৎকার:
রংপুর জোনে বদলি হওয়ার পরও আবুল খায়েরের দুর্নীতির চাকা থামেনি। সেখানে তার বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বেশ কয়েকজন ঠিকাদার সরাসরি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি টেলিভিশন ‘৭১ টিভি’ (Ekattor TV)-তে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা তার বিরুদ্ধে সরাসরি লাইভ ফিড সাক্ষাৎকার দেন, যা আজও অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্যমান। একজন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের এমন প্রকাশ্য লাইভ সাক্ষাৎকার সে সময় প্রশাসনিক মহলে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল।
ন্যাশনাল হাউজিংয়ে ৫০ কোটির কেলেঙ্কারি:
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বা গণপূর্তের অন্যান্য খাতের পাশাপাশি ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটিতে থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সেখানে সরকারি প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনি প্রায় ৫০ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ঢাকা জোনে ‘মিস্টার ৫%’ এবং ২৪ ফ্ল্যাটের মালিকানা:
বর্তমানে ঢাকা জোনে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার নাম হয়ে গেছে ‘মিস্টার ৫% পারসেন্ট’। প্রজেক্ট অনুমোদন কিংবা ঠিকাদারদের বিল পাসের জন্য ৫% কমিশন দেওয়া এখন ওপেন সিক্রেট। এই দুর্নীতির টাকা দিয়ে রাজধানী ঢাকা এবং এর আশেপাশে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের সাম্রাজ্য।
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী আবুল খায়েরের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খতিয়ান:
বেনামী ফ্ল্যাট: ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় আবুল খায়েরের নামে ও স্বজনদের বেনামে অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। ন্যাশনাল হাউজিং ও পূর্বাচলে জমি: মোহাম্মদপুরে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের বিশাল ফ্ল্যাটসহ ঢাকার পূর্বাচলে রয়েছে একাধিক কোটি টাকার প্লট ও জমি।
ময়মনসিংহে বিঘায় বিঘায় জমি:
ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহের গ্রামীণ ও শহরতলী এলাকায় নামে-বেনামে বিঘায় বিঘায় কৃষিজমি ও খামারবাড়ি কিনে রেখেছেন এই প্রকৌশলী।
এবিষয়ে আবুল খায়েরের সাথে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি তবে এক ঠিকাদার দিয়ে কথা বলতে চেষ্টা করেন।
তদন্তের দাবি ও বর্তমান পরিস্থিতি:
দেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে শুদ্ধি অভিযান ও দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা জোরদার হলেও এই ‘মিস্টার ৫%’ খ্যাত খায়ের এখনো তার বেনামী সম্পদ ও প্রভাব টিকিয়ে রাখতে নানাভাবে তদবির চালাচ্ছেন। সাধারণ ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সৎ কর্মকর্তারা অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তার সকল অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত