নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
‘সংস্কৃতিকে একটি জাতি ও রাষ্ট্রে দর্পণস্বরূপ’ বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, জাতি কতটা সভ্য বা উন্নত সেটির পরিমাপ দেয় সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে। যে সমাজ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ সে সমাজ শান্তি ও আনন্দে সমৃদ্ধ।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবে টেলিভিশন রিপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ট্র্যাব) আয়োজিত ‘ট্র্যাব বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ট্র্যাব সভাপতি কাদের মনসুরের সভাপতিত্বে ও দুলাল খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী, তাশিক আহমেদ, কামরুল হাসান দর্পণ, শফিকুর রহমান, সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম রনি, ওমর ফারুক মুন্না, লায়ন আনোয়ারা বেগম নিপা প্রমুখ বক্তব্য দেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, `সংস্কৃতি ছাড়া মানুষের জীবন মূল্যহীন। সংস্কৃতি আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধ। সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করে সংস্কৃতি। আমাদের চিন্তাধারাকে প্রসারিত করে, আমাদের সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। সংস্কৃতি মানুষের আত্মাকে আলোকিত করে।’
সংস্কৃতি নিয়ে মানুষের এত মাতামাতির কারণ হিসেবে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, ‘সংস্কৃতিতে পরিচয় মেলে একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, চরিত্র, রুচিবোধ, চালচলন বা জীবনবোধ। পশুর জীবনে সময়ের তালে বাঁচার প্রক্রিয়ায় উন্নতি আসে না। তাই তাদের পরিচয়, তাদের জীবনবোধ সব সময় একই থাকে। কিন্তু মানুষ তার সমাজকে নিয়ে সামনে এগোয়, আগের চেয়ে উন্নততর ও সভ্য হয়। হাজার বছর আগে পশু যা খেত আজও তাদের খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান অবিকল আছে। কিন্তু মানুষ সামনে এগিয়েছে। ‘
এক সময় মানুষ বস্ত্রহীন ছিল, এরপর গাছের ছাল, পশুর চামড়া এবং পাতা ব্যবহার করে পোশাক হিসেবে। এখন মানুষ সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে। আদিম যুগে মানুষ কাঁচা মাংস খেতো; ফল, শিকড় এবং অন্যান্য বন্য উৎস থেকে সংগৃহীত খাবার খেত। এখন মানুষ রান্না করা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার খায়। সামনে এগোনোর এই প্রক্রিয়াকে সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেন কাদের গনি চৌধুরী।
বিএফইউজে মহাসচিব আরও বলেন, ‘খনির স্বর্ণ আর অলংকারের স্বর্ণ এক নয়, উভয়ের মাঝে যে পার্থক্য তার পশ্চাতে থাকে দীর্ঘ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। তেমনি সভ্য মানুষ আর অসভ্য মানুষ এক নয়। এই পার্থক্যের মূলে থাকে একটি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সংস্কারের এই ক্রিয়াশীল প্রক্রিয়াকে বলা হয় সংস্কৃতি। ‘
একেক দেশে একেক ধরনের সামাজিকতা ও সংস্কৃতির বিরাজমানতার কথা উল্লেখ করে এই সাংবাদিক নেতা বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতি সম্প্রীতির সংস্কৃতি। এ ঐতিহ্য আমরা যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী লালন করে আসছি। এখানে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশে হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। যেখানে নেই কোনো হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান দ্বন্দ্ব, নেই জাতি ধর্মের বিদ্বেষ। ’
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন নিদর্শন দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল বলে মন্তব্য করে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ৫২, ৬৯, ৭০, ৭১, ৯০ ও ২০২৪ সালে এ জাতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বাক্ষর রেখেছে। তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর একতাকে চিরভাস্বর করেছে। মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, খাসিয়া, সাঁওতাল নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে যুদ্ধ করেছে। আমাদের প্রত্যেকটি উৎসবে বাঙালি জাতি এক হয়ে যায়। পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, বৈসাবি আর জাতীয় দিবসগুলোতে সাম্প্রদায়িক পরিচয় ভুলে এক জাতি হিসেবে সকলে সমান অংশগ্রহণ করে। এটাই আমাদের ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে। ‘
এই ঐতিহ্য বিনষ্ট করে সমাজে ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে একটি মহল- এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, ‘তারা আজ মাজার ভাঙছে, কবর থেকে লাশ তুলে পোড়াচ্ছে, বাউলদের পেটাচ্ছে। এটা আমাদের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নয়। এটা মব। ‘
‘ঘৃণা কখনো জ্ঞান থেকে ছড়ায় না। এটা ছড়ায় অজ্ঞতা ও অন্ধবিশ্বাস থেকে। ‘ এ কথা উল্লেখ করে কাদের গনি চৌধুরী ।মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের ঘাতক ও মিশরীয় লেখক নাগিব মাহফুজের হত্যা চেষ্টাকারীর সঙ্গে বিচারকের কথোপকথন তুলে ধরেন।
আসামিকে বিচারক প্রশ্ন করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট সাদাতকে কেন হত্যা করেছিলে তুমি? উত্তরে সে বললো, কারণ তিনি সেক্যুলার ছিলেন। বিচারক জানতে চাইলেন সেক্যুলার মানে কী? উত্তরে সে বললো "আমি জানি না।" প্রয়াত মিশরীয় লেখক নাগিব মাহফুজকে ছুরি মেরে হত্যা চেষ্টাকারী একজনকে প্রশ্ন করেছিলেন বিচারক, কেন তুমি মাহফুজ সাহেবকে ছুরিকাঘাত করেছো?
জবাবে সে বলল, কারণ তিনি ধর্মবিরোধী উপন্যাস ‘চিলড্রেনড অফ গেবালাবি’ লিখেছিলেন। বিচারক আগ্রহ প্রকাশ করলেন, ‘তুমি পড়েছো সে উপন্যাস?’ সে বলল, "না।"
মিশরীয় সাহিত্যিক ফারাজ ফাওদাকে হত্যাকারী সন্ত্রাসীকে প্রশ্ন করেছিলেন বিচারক, ফারাজ ফাওদাকে মেরে ফেললেন কেন? সন্ত্রাসী বলেছিল, কারণ তার ঈমান নেই। বিচারক জানতে চাইলেন, তুমি কীভাবে বুঝলে তার ঈমান নেই! সে বলেছিলো, তার বইগুলো পড়লেই বুঝা যায় তার ঈমানহীনতার পরিচয়। বিচারক বললেন, ফারাজ ফাওদার কোন বই পড়ে তুমি বুঝতে পেরেছো তার ঈমানহীনতার বিষয়? জবাবে বললো সে, না, আমি পড়িনি। কিছু লোক বলছিলো আর তা আমি শুনেছি, তাতেই বুঝা যায় তার ঈমান নেই।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, এসব ঘটনায় বোঝা যায়, ঘৃণা কখনো জ্ঞানের মাধ্যমে ছড়ায় না, বরং অজ্ঞতার মাধ্যমে ছড়ায়। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমাদের উচিত সে বিষয় সম্পর্কে যথাযথ জানা, সম্ভব হলে প্রমাণসহ।’ একটি জাতির স্বাধীনতাকে এক দুর্লভ ও পরম কাঙ্ক্ষিত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে কাদের গনি চৌধুর বলেন, ‘অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা সুরক্ষিত করার দায়িত্ব প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের অপরিহার্য কর্তব্য। স্বকীয় জাতিসত্তা ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতির লালন ও বিকাশের দ্বারাই স্বাধীনতার ভিতকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করা সম্ভব। ’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত