নিজস্ব প্রতিবেদক॥
আজ মঙ্গলবার ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তির দিন। বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল এই দিনটির জন্য গর্ববোধ করবে। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে এই দিনে পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামের একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাম সংযোজন করে। প্রতি বছর দেশের মানুষ এই দিনটিকে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে উদযাপন করে।
এবার দেশের এক রূপান্তরকালে উদযাপিত হচ্ছে বিজয় দিবস। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় দায়িত্ব নেবে নির্বাচিত সরকার। এ সময়ে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। এবং সেটা উচ্চারিত হচ্ছে দেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী সব দলের নেতাদের বক্তব্যে।
পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে যখন এ দেশের ঘুমন্ত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর ট্যাংক-কামানের মতো ভয়ংকর মারণাস্ত্র নিয়ে নৃশংস গণহত্যার পৈশাচিকতায় মেতে উঠেছিল, তখনই শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ সংগ্রাম, স্বাধীনতার জন্য সম্মুখ যুদ্ধ।
দেশের বীর সন্তানেরা যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গিয়েছিলেন শত্রুর মোকাবিলায়। জীবনের মায়া তাদের কাছে ছিল তুচ্ছ। তাদের ছিল না যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, ছিল না কোনো উন্নত সমরাস্ত্র। আক্ষরিক অর্থেই যার কাছে যা ছিল, তা নিয়েই দেশের বীর সন্তানেরা শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মরণপণ লড়ে যান মুক্তির সংগ্রামে।
দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেন দেশের সব ধর্ম, বর্ণ, ভাষার বীর সন্তানেরা। শেষ পর্যন্ত ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর বিপুল সম্পদহানির ভেতর দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে সফল হন মুক্তিযোদ্ধারা। ছিনিয়ে আনেন চূড়ান্ত বিজয়। জাতিকে মুক্ত করেন পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে।
গত ১৬ বছর ধরে পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি করে ঔপনিবেশিক ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে দেশকে বিভাজিত করে বাংলাদেশকে লুটেপুটে খেয়েছে গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ। এই বিভাজনকে সহ্য করতে পারেনি দেশের মানুষ। ফলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ফের শুরু হয় লড়াই-সংগ্রাম। অবশেষে ৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে এক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়।
নতুন শুরু হওয়া এ যাত্রা নিয়ে কথা বলেছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তারা বলছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে এবারের বিজয় দিবস জাতির সামনে এক নতুন প্রত্যাশা নিয়ে হাজির হয়েছে।
বাসস-এর সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তারা বলেছেন, বদলে যাওয়া নতুন বাংলাদেশে, বিজয় দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে আনন্দের সঙ্গে রয়েছে ঘোর সংশয়। ফ্যাসিবাদী অপশক্তি আবারো মাথাচাড়া দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে গণতন্ত্রের উত্তরণের প্রাক্কালে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে পারলে বিজয়ের আনন্দ চিরস্থায়ী হবে বলে তারা মনে করছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম বিজয় দিবস আমরা গত বছর পালন করেছি। সেই বিজয় দিবসের আনন্দ উৎসব বিজয় উল্লাস ছিল অন্যরকম। মুক্ত স্বাধীন পরিবেশে মানুষ মন ভরে বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করেছে। এরপরে এক বছর পার হয়ে গেলেও নানা পরিক্রমার মধ্যে দিয়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে কিছু বিভক্তি দৃশ্যমান হয়েছে। এসব বিভক্তির ফলে অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শক্তি আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, সেটা এখন দৃশ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হওয়ার পরে একটি ঘটনায় ( হাদির ওপর হামলা) বেদনা বিধুর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি, গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করতে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তার দোসররা সকল চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই সময়ে আমাদেরকে প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র সুসংহত করার জন্য বাংলাদেশের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তি ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্য এখন সবচাইতে বেশি জরুরি। কারণ, এর মাধ্যমেই আমরা কেবল মাত্র সন্ত্রাসবাদী, গণতন্ত্র বিরোধী তৎপরতা বা ফ্যাসিবাদী শক্তির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার যে অপচেষ্টা, সেটা রুখে দিতে পারব।
বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান কাজ হলো-ফ্যাসিবাদ বিরোধী জাতীয় ঐক্যকে জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে পারব। এটাই আমাদের বিজয়ের উচ্ছ্বাস, জাতীয় প্রত্যাশা এবং শহীদদের রক্তের ঋণ শোধের উপায়।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বিজয় দিবস জাতির ইতিহাসে আত্মত্যাগের মহিমায় এক গৌরবের দিন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লব মুক্তিযুদ্ধকে পরিপূর্ণতা দানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে জাতির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই বিজয়ের এই দিনে সকলের প্রতি আহ্বান থাকবে আসুন, আমরা সকল বিভেদ ভুলে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষের উপনিবেশ বিরোধী লড়াই থেকে শুরু করে পাকিস্তান আন্দোলন হয়ে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সবগুলোর ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘসময় ধরে নিজেদের মর্যাদা ও পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে এসেছে। ফলে ২০২৪-কে ১৯৭১-এর মুখোমুখি দাঁড় করানোর যে প্রচেষ্টা সেটি আমরা প্রত্যাখ্যান করি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে আগের সংগ্রামগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সব আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতা, মুক্তি ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ যতবারই অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক উপনিবেশিকতার শিকার হয়েছে, ততবারই বাংলাদেশের মানুষ তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদার এই সংগ্রামে ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪—সবই একই সুতোয় গাঁথা।
বিজয় দিবস উপলক্ষে তিনি বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ লড়াই, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।মাহফুজ আলম বলেন, আমাদের কোনো শহীদের রক্তের রঙ আলাদা নয়। সবাই এই মাটির মানুষ, এই মাটির পক্ষে লড়া সৈনিক।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত