ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজারঃ
ডেডস্পট হয়ে ওঠেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা-শিল্পাঞ্চল। মাত্র ৪৭ ঘন্টার ব্যবধানে দেশের সবচেয়ে শান্তিময় উপজেলা হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলের পৃথক তিনটি চা বাগানের জলাধার থেকে তিন ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সর্বশেষ শনিবার (৯ মে) বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার ৭ নম্বর রাজঘাট ইউনিয়নের ফুসকুঁড়ি চা বাগানের ৪ নম্বর শ্রমিক বস্তির বাসিন্দা চা শ্রমিক সবুজ কর্মকারের বাড়ির পুকুর থেকে উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দরখান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ষাড়েরগজ (বটের তল) গ্রামের মৃত কমর আলীর ছেলে আবেদ আলীর (৭০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কৃষিজীবী আবেদ আলী গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) থেকে নিখোঁজ ছিলেন এবং তার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ ছিল বলে তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। শনিবার (৯ মে) বাড়ি থেকে প্রায় তিনি কিলোমিটার দুরে ফুসকুঁড়ি চা বাগানের ৪ নম্বর শ্রমিক বস্তির বাসিন্দা চা শ্রমিক সবুজ কর্মকারের বাড়ির পুকুরে আবেদ আলীর মরদেহ ভেসে ওঠে। পরে স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. ওয়াহিদুজ্জামান রাজুসহ পুলিশ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিবারের অভিযোগ ফুসকুঁড়ি চা বাগানের ৪ নম্বর শ্রমিক বস্তির বাসিন্দা ভুট্টো কর্মকার গরু বিক্রির কথা বলে তাকে ডেকে আনেন। নিহতের সাথে গরুর ক্রয়ের টাকা ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে ভুট্টো পলাতক।
এর আগে একইদিন (শনিবার-৯ মে) সকালে উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা বাগানের রামপাড়া এলাকায় অবস্থিত চা-শ্রমিক অজয় হাজরার বাড়ির পুকুর থেকে মোহাম্মদ হোসেন (৫৫) নামের এক রিকশাচালকের মরদেহ উদ্দার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, সকালে নিহতের পা পানির উপরে ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুকুর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। তার মূল বাড়ি কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের খোজারকলা গ্রামে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি শ্রীমঙ্গলে বসবাস করে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন বলে জানা গেছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) সন্ধ্যার পর উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা বাগান লেক থেকে অন্তর রায় (৩৫) নামের এক অটোরিকশা চালকের মরদেহ ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন বিকেলে দিকে তার মরদেহ পানির উপরে ভাসতে দেখে স্থানীয় চা-শ্রমিকরা পুলিশ ও ফায়াস সার্ভিসে খবর দেন। পরে শ্রীমঙ্গল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দিপংকর হালদারের নেতৃত্বে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ার লিডার আকতার হোসেনের নেতৃত্বে ফায়ার কর্মীরা লেক থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত অন্তর রায় উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের শাহজিবাজার (পালপাড়া) এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
এদিকে মাত্র ৪৭ ঘন্টার ব্যবধানে শ্রীমঙ্গলের তিনটি চা-বাগানের জলাধার থেকে তিন ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকার মানুষ বিশেষ করে চা বাগানের বাসিন্দারা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক বিষ্ণু হাজরা বলেন, আমাদের বাগানের লেক ও পুকুর থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের পর বাগানের সাধারণ নিরীহ শ্রমিক তথা নারী শ্রমিকরা ভয় আর আতঙ্কে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার ও শনিবারে আমাদের বাগান থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের পর অনেক নারী শ্রমিক ভয়ে ভয়ে চা বাগানের সেকশনে পাতা তুলতে গিয়েছেন।’
উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়েনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) আবুল খায়ের সিদ্দিক মুরাদ বলেন, বৃহস্পতিবার (৭ মে) থেকে আমার ওয়ার্ডের ষাড়েরগজ (বটের তল) এলাকার প্রবীন ব্যক্তি আবেদ আলী নিখোঁজ ছিলেন। আমাকে তার পরিবারের সদস্যরা আজ (শনিবার) সকালে বিষয়টি জানান এবং তারা খোঁজাখুঁজি অব্যাহত রাখেন। নিখোঁজ আবেদ আলীকে খোঁজাখুঁজি চলমান থাকাবস্থায় সিন্দুরখান ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী রাজঘাট ইউনিয়নের ফুসকুড়ি চা বাগানের একটি বাড়ির পুকুরে তার মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। আজ বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ স্থানীয়দের সহায়তায় তার মরদেহ পুকুর থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। নিহত ব্যক্তির মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তিনি হয়তো নিখোঁজের সময় পেঁয়াজ কিনেছিলেন বাড়ির জন্য। মরদেহের হাতের আঙ্গুলে বাধা অবস্থায় পেঁয়াজের প্যাকেটও ছিল। এ ঘটনায় আমাদের এলাকায় চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না তিন চা-বাগানের জলাধার থেকে তিন ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বলেন, শনিবার (৯ মে) সকালে ও বিকেলে দুটি চা বাগানের পুকুর থেকে আমরা দুটি মরদেহ উদ্ধার করেছি। আমরা উদ্ধারকৃত সবগুলো মরদেহ নিয়েই কাজ করতেছি। শনিবার সকালের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নিহত রিকশাচালক মোহাম্মদ হোসেনের আঙ্গুলের ছাপের মাধ্যমে নাম-ঠিকানা সংগ্রহ ও সনাক্ত করেছি। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভাড়াউড়া চা বাগানের লেক থেকে উদ্ধারকৃত ব্যক্তির মরদেহ একই হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের পর তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি।
তার পরিবার হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ওই মরদেহের সৎকার করেছেন। প্রাথমিকভাবে বৃহস্পতিবার ও শনিবার সকালে উদ্ধারকৃত দুটি মরদেহের ব্যাপারে থানায় পৃথক ইউডি মামলা হয়েছে। তবে এসব মরদেহ উদ্ধার ঘটনার কোনটিকেই আমরা সন্দেহের বাইরে রাখছি না। এসব ঘটনাগুলোকে হত্যাকান্ড হিসেবে সামনে রেখেই আমরা অত্যন্ত তৎপর রয়েছি। পুলিশের একবাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই আমরা সামনের দিকে এগোচ্ছি। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলামের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত