শেখ তাইজুল ইসলাম, মোংলা প্রতিনিধিঃ
মা-হারা মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরম মমতায় নিজ জমির অর্ধেকটা লিখে দিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু সেই মমত্ববোধই যে একদিন কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনাও করেননি মোংলার বৃদ্ধ হায়দার আলী। সম্পত্তির লালসায় অন্ধ হয়ে আপন মেয়েই বাবাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন বাড়ি থেকে। শুধু তাই নয়, গত ১০ বছর ধরে নিজের ভিটায় ফেরার লড়াই চালানো বাবাকে দমাতে দায়ের করেছেন মিথ্যা মামলা। আদালতের নির্দেশের পর বাড়ি ফিরতে চাইলেও মেয়ে-জামাই আর নাতিদের সশস্ত্র হামলার মুখে পিছু হটতে হয়েছে অসহায় এই পিতাকে। নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী বাবা এখন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের উত্তর মালগাজী এলাকায়।
বার্ধক্যের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন দিশেহারা ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলী হায়দার। নিজের তিল তিল করে গড়া সম্পত্তি এখন তার একমাত্র বড় মেয়ের দখলে। শুধু সম্পদ দখলই নয়, অভিযোগ উঠেছে নিজ পিতাকে হত্যারও। স্থানীয়রা জানান, ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলী হায়দার দীর্ঘদিন ধরে তার ক্রয়কৃত জমিতে ভোগদখল করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি তার মেয়ে নুরজাহান এবং তার স্বামী মিলে ওই জমির মালিকানা দাবি করে বসেন। জোরপূর্বক জমির চারদিকে বেড়া দিয়ে তারা প্রকৃত মালিককে সেখানে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছেন। বর্তমানে ওই জমিতে মেয়ে ও জামাতা স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করছেন এবং বৃদ্ধ বাবাকে সেখানে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা আরো জানান, ভুক্তভোগী বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলী হায়দার পানি টেনে তার পরিশ্রমের টাকা দিয়ে ১৯৯৬ সালে একই দলিলে নিজ নামে ও মেয়ের নামে মোট ৮কাঠা (২০.৭৫ শতক) জমি কিনেন। মেয়ে তখন অন্নত্র ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। পরবর্তীতে মেয়ের নামের ৪কাঠায় বসত বাড়ি তৈরী করে বসবাস করছেন, আর বাবার ৪কাঠায় পুকুরে মাছ চাষ করতেন পিতা মোহাম্মদ আলী হায়দার। হঠাৎ কৌশলে বাবার কাছ থেকে দলিলের মুল কপি নিয়ে ৮কাঠা জায়গাই বেড়া দিয়ে আটকিয়ে দেয় মেয়ে নুরজাহান। ২০২৩ সালে নূর জাহান তার বৃদ্ধ বাবাকেই আসামি করে আদালতে একটি হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মেয়ে নুরজাহান আদালতে জমির স্বপক্ষে কোনো বৈধ দলিল দেখাতে না পারায় মামলার দীর্ঘ প্রায় ৩বছর পর চলতি বছরের ৩০ মার্চ বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় মামলাটি খারিজ করে দেন।
আদালতের রায়ের কপি নিয়ে হায়দার আলী তার এক ছেলে ও এক মেয়েকে সাথে নিয়ে নিজ বাড়িতে উঠতে যান। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা বাড়িতে পা রাখা মাত্রই নূর জাহান বেগম ও তার জামাই ও সন্তানরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের মারধর করে আবারও সীমানা প্রাচীরের বাইরে বের করে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে মোংলা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এই ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, বিষয়টি নিয়ে একটি সালিশি বৈঠক ডাকা হয়েছিল, কিন্তু মেয়ের পক্ষ সেখানে উপস্থিত হয়নি। ভুক্তভোগী বাবা বর্তমানে আইনি সহায়তার জন্য স্থানীয় উপজেলা পরিষদে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধ বাবা জানান, আমার শেষ বয়সের সম্বল এই জমিটুকু। আমি তাকে স্নেহ করে আশ্রয় দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন সে আমাকেই নিজের জমি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছে। আমি ভেবেছিলাম শেষ বয়সে মেয়ের কাছে শান্তিতে থাকব। কিন্তু সে আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে আমার সবটুকু কেড়ে নিয়েছে। এখন আমি নিজের বাড়িতেই পরবাসী। আমি এর সঠিক বিচার চাই। আমি আমার অধিকার ফিরে পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত মেয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বরং জামাতা শশুরকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। তবে জমির স্বপক্ষে কোনো বৈধ দলিল তিনি দেখাতে পারেননি মেয়ে নুরজাহান।
এই অমানবিক ঘটনার বিচার চেয়ে এবং নিজ নামের জমি ফিরে পেতে স্থানীয় উপজেলা পরিষদে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন অসহায় পিতা। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছেন। এলাকাবাসীর মতে, বাবার ওপর মেয়ের আচরণ অত্যান্ত উশৃংখল। নিজের বাবার সাথে এমন আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং তারা বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলী হায়দারের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা কামনা করছেন।
এ বিষয়ে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। আদালতের রায় হায়দার আলী পক্ষে থাকায় তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদারকি করছি। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং হামলার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত