মো.হাবিবুর রহমানঃ
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ‘এল নিনো' দ্রুত একটি শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে চরম বৈরী আবহাওয়ার শঙ্কা বাড়ছে বলে শুক্রবার (৩ জুলাই) সতর্ক করেছে জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এটি দ্রুতই আরও শক্তি সঞ্চয় করবে। সম্ভাব্য এই ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। এর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুর চাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো তৈরি হয় এবং এটি ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই পরিস্থিতি দক্ষিণ আফ্রিকায় খরা ডেকে আনে বলে জানা যায়। অর্থনীতিবিদেরা ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। আবহাওয়ার এই অবস্থা মূলত এল নিনো এবং এর ঠিক বিপরীত অবস্থা 'লা নিনা'-এর মধ্যে ওঠানামা করে। এ দুয়ের মাঝামাঝি সময়ে একটি নিরপেক্ষ অবস্থাও বিরাজ করে। ডব্লিউএমওর মাসিক গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট বা বৈশ্বিক ঋতুভিত্তিক জলবায়ু হালনাগাদ প্রতিবেদনে জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে একটি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি দ্রুত তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি এল নিনো পরিস্থিতিকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অতি শক্তিশালী-এই চারটি স্তরে ভাগ করে থাকে। অর্থাৎ, এবারের এল নিনো চারটির মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্তরে (শক্তিশালী) পৌঁছাতে যাচ্ছে। ডব্লিউএমও বলেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে এটি দ্রুত আরও শক্তিশালী হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্বের অনেক অংশে চরম বৈরী আবহাওয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তাপপ্রবাহের ঝুঁকি: জেনেভাভিত্তিক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক জলবায়ু কেন্দ্রগুলোর তৈরি করা পূর্বাভাসে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সংস্থাটি বলছে, মূল পর্যবেক্ষণ অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রার অসংগতি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসের মধ্যে ‘অসাধারণ মিল’ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএমও, যা এই আশঙ্কার ওপর উচ্চ মাত্রার আস্থা প্রদান করে। ডব্লিউএমও আরও জানিয়েছে, উত্তর গোলার্ধে শরৎকালজুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে থাকবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে। অন্যদিকে নিরক্ষীয় আটলান্টিক অববাহিকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতবারের এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সাল ছিল রেকর্ড অনুযায়ী দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর। আর ১৮৫০-১৯০০ সালের প্রাক্-শিল্প যুগের গড়ের চেয়ে প্রায় ১.৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা নিয়ে ২০২৪ সাল ছিল সর্বকালের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। সাধারণত এল নিনো নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও, এর ফলে তাপমাত্রার তীব্র বৃদ্ধি সাধারণত বেশ কিছুটা পরে অনুভূত হয়। ডব্লিউএমওর প্রধান সেলেস্তে সাউলো বলেন, এল নিনো পরিস্থিতি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এটি দ্রুত একটি শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক অঞ্চলে খরা ও ভারী বৃষ্টির শঙ্কা তীব্র হবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়বে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য, বিশেষ করে কৃষি ও স্বাস্থ্যের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে আগাম সতর্কীকরণ সহায়তা বাড়াচ্ছে। সাউলো বলেন, উন্নত ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কতা জীবন বাঁচাতে এবং আমাদের অর্থনীতি ও সম্প্রদায়ের ওপর বিরূপ প্রভাব কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাপমাত্রার প্রভাব: হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেরু অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব জনবহুল এলাকা (৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ থেকে ৬০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত) জুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসও শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মতো কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশসহ পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার বড় অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। ডব্লিউএমও বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর পুনরাবৃত্তি বা তীব্রতা বৃদ্ধির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে সংস্থাটি বিশ্বাস করে যে, জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাবগুলোকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, সাগর ও বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হওয়ার ফলে তাপপ্রবাহ ও ভারী বৃষ্টিপাতের মতো চরম আবহাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও আর্দ্রতার প্রাপ্যতা বেড়ে যায়। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট উষ্ণ জলরাশি প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে হ্যারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে ইন্ধন জোগাতে পারে, অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরে এগুলোর উৎপত্তিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত