স্টাফ রিপোর্টার॥
কিছুতেই দুরবস্থা কাটছে না ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। দিন দিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় থাকা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার এখন সবচেয়ে বেশি। তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও খেলাপি ঋণ বাড়ছে। প্রকাশিত সমন্বিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পি কে হালদারের অনিয়মের জের টানতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, গত মার্চ মাস শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে এই খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২৬ হাজার ২৯২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ফলে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪০২ কোটি ৫ লাখ টাকা। মোট বিতরণ ৭৮ হাজার ৩৯১ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
এর আগে ডিসেম্বরে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। খেলাপির এই হার খাতটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস শেষে খাতটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ২৫১ কোটি টাকা।
তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি হারে খেলাপি ঋণ বাড়ছে ব্যাংকে। কারণ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংকগুলোর লুকানো খেলাপি ঋণ এখন সামনে আসছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক বছর ধরেই কঠোর তদারকির কারণে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র এখন প্রকাশ্যে আসছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোতে তদারকি শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে। এ জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকের তারল্য সংকট প্রকট হওয়ায় বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও খারাপ হয়েছে। কিছু ব্যাংক যখন গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত সরিয়ে নেন গ্রাহকরা। এ কারণে ওইসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ বিতরণ কমিয়ে দেয়। ফলে তাদের আমানত ও ঋণ—দুই-ই কমে গেছে।
আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত ব্যক্তি পি কে হালদার বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যে অনিয়ম করে গেছেন, এখনো তার জের টানতে হচ্ছে পুরো খাতকে। পি কে হালদারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় ছিল এমন কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই খারাপ। পি কে হালদার যখন এসব অনিয়ম করেন, তখন তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন আভিভা ফিন্যান্স ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। যার মধ্যে আভিভা ফিন্যান্সকে বন্ধের তালিকায় এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক সংকটে থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করে। তবে তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় দেওয়া হয়েছে। যে ছয়টি বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক সে প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ফাস ফিন্যান্স, বিআইএফসি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। অন্যদিকে ছয় মাস সময় নেওয়া তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো—জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। এগুলো এখনই অবসায়ন করা হচ্ছে না। এসবের আর্থিক সূচকে উন্নতি দেখাতে তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত।
এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলেও ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই অর্থ জোগান দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে পরিচালককে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও দুজন করে কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি অকার্যকর ঘোষণা করা হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯টিতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি আমানত আটকে পড়েছে পিপলস লিজিংয়ে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া আভিভা ফিন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এই হিসাবে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, যেহেতু এনবিএফআইগুলোর বেশিরভাগেরই অবস্থা খারাপ এবং তাদের এখানে আদায় কার্যক্রম খুবই দুর্বল। এক কোয়ার্টারের পরে যখন আরেকটি কোয়ার্টার হয় তখন নতুন করে ইন্টারেস্টগুলো যোগ হয়। তার সঙ্গে আদায় তো সে পরিমাণ হচ্ছে না। এ কারণে বকেয়ার স্থিতির পরিমাণ আরও বাড়ে।
তিনি বলেন, অবসায়ন থেকে আপাতত রক্ষা পাওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচিত খেলাপি ঋণ আদায়ের ব্যাপারে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। এটার প্রমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখতে চায়। তারপরও যদি আদায় না হয় সেটা ভিন্ন কথা, কিন্তু সর্বশেষ অস্ত্র যেটা আছে সেগুলো তারা প্রয়োগ করেছে—এটা তাদের প্রমাণ করতে হবে। তারা যদি সিগনিফিকেন্ট ডেভেলপমেন্টই দেখাতে না পারে তখন আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৬ থেকে ১৫ গুণ বেশি। ভারতে খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া ভুটানে এ হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত