জসিম উদ্দিনঃ
বৃষ্টির মৌসুম এলেই রাজধানী ঢাকা যেন এক পরিচিত দুর্ভোগের নগরীতে পরিণত হয়। কয়েক ঘণ্টার মাঝারি বা ভারী বৃষ্টিতেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অসংখ্য সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ সময় অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী সবার জীবন থমকে যায় জলাবদ্ধতার কারণে। নগরবাসীর কাছে এটি এখন আর নতুন কোনো দুর্যোগ নয়! প্রতি বর্ষায় ফিরে আসা এক দীর্ঘস্থায়ী সংকট। প্রশ্ন হলো, এত পরিকল্পনা, এত প্রকল্প এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন ঢাকার এই জলাবদ্ধতা কমছে না?
আসলে ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ব্যর্থতা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল সমন্বয়, দখলদারত্ব, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাগরিক অসচেতনতার সম্মিলিত পরিণতি। রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল, জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল একসময় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করত। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের নামে এসব জলাধার ভরাট হয়েছে, খাল দখল হয়েছে, অনেক ড্রেন ও নালা বর্জ্যে ভরে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ হারিয়ে ফেলেছে।
কথা সত্য, গত কয়েক বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ উন্নয়ন, খাল পরিষ্কার এবং পাম্প স্থাপনের মতো কাজও হয়েছে। কিন্তু তা জনদুর্ভোগ কমাতে পারেনি।
বাস্তবতা হলো, সামান্য বৃষ্টিতেই বহু এলাকায় হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানি জমে যায়। এর অন্যতম কারণ হলো প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি। বর্ষা শুরু হওয়ার আগে যেসব ড্রেন পরিষ্কার হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তা সময়মতো সম্পন্ন হয় না। কোথাও নির্মাণকাজ চলতে থাকে বর্ষার মধ্যেই, ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
জলাবদ্ধতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। রাজধানীতে সড়ক, ড্রেন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নিয়ে একাধিক সংস্থা কাজ করে। অনেক সময় একটি সংস্থা রাস্তা খনন করে, অন্য সংস্থা তা মেরামত করতে দেরি করে।
কোথাও নতুন ড্রেন নির্মাণ হলেও সেটি বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে সঠিকভাবে সংযুক্ত হয় না। ফলে উন্নয়নকাজের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায় না। একটি আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময়, পরিকল্পনার সমন্বয় এবং জবাবদিহিতামূলক কার্যক্রম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকার জলাবদ্ধতার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি বা ভারী বর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। পুরনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা এত বেশি পানি একসঙ্গে বহন করার জন্য পরিকল্পিত ছিল না। তাই নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে ড্রেনেজ অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে। শুধু অতীতের অভিজ্ঞতা নয়, ভবিষ্যতের জলবায়ুগত ঝুঁকিও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। বিশ্বের অনেক শহরে স্মার্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, সেন্সরভিত্তিক পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও যদি আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে কোথায় পানি জমছে, কোথায় ড্রেন বন্ধ হয়ে গেছে বা কোথায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এসব তথ্য দ্রুত জানা সম্ভব হবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণও হবে দ্রুত এবং কার্যকর।
শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, খাবারের প্যাকেট কিংবা নির্মাণবর্জ্য ড্রেনে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা এখনও ব্যাপক। এসব বর্জ্য ড্রেনের মুখ বন্ধ করে দেয় এবং পানি নিষ্কাশনে বড় বাধা সৃষ্টি করে। একটি পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের নয়। প্রতিটি নাগরিকেরও নৈতিক দায়িত্ব। সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধারের কাজ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বহু খাল এখনও দখল ও দূষণের শিকার। কোথাও খালের প্রস্থ কমে গেছে, কোথাও আবার বর্জ্যের স্তূপ জমে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। খাল উদ্ধার অভিযান যেন সাময়িক কর্মসূচি না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হয়। উদ্ধার করা খাল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দখলমুক্ত রাখার জন্য কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। অন্যথায় কয়েক বছরের মধ্যেই আগের পরিস্থিতি ফিরে আসবে।
নগর পরিকল্পনায়ও মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। নতুন আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক ভবন বা সড়ক নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। প্রয়োজনীয় জলাধার, উন্মুক্ত স্থান এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ভবনের নকশায় রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
এতে একদিকে জলাবদ্ধতা কিছুটা কমবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও হ্রাস পাবে।জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, ব্যয় এবং ফলাফল নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। নাগরিকরা যেন জানতে পারেন কোন এলাকায় কী কাজ হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং তার বাস্তব সুফল কী। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওপর দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার চাপও তৈরি হবে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য জলাবদ্ধতা নিরসন কেবল একটি প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং নাগরিক জীবনের সঙ্গে বিশেষ ভাবে জড়িত একটি বিষয়। জলাবদ্ধতার কারণে যানজট বাড়ে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হয়, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের জীবনমান নিম্নমুখী হয়।
তাই এটিকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন নগর ব্যবস্থাপনার একটি অগ্রাধিকার ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রাজধানীর মানুষ প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। তারা চায় কার্যকর পরিকল্পনা, সময়মতো বাস্তবায়ন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনিক উদ্যোগ।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও হতে হবে সচেতন ও সহযোগিতাপূর্ণ। সরকার, দুই সিটি করপোরেশন, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি জলাবদ্ধতামুক্ত, বাসযোগ্য ও টেকসই ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব।
পরিশেষে বলব, এই জলাবদ্ধতা আজ আর শুধু বৃষ্টির পানি জমে থাকার গল্প নয়; এটি আমাদের পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধেরও প্রতিচ্ছবি। তাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখন সময় দোষারোপের নয়, বরং সমন্বিত ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ গ্রহণের। তাহলেই হয়তো একদিন বর্ষার বৃষ্টি দুর্ভোগের নয়, স্বস্তি ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠবে রাজধানীবাসীর জীবনে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত