মো: মহিব্বুল্লাহঃ
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জোন ৭/১-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক আল নাঈম মুরাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও শ্যামপুর থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণকারী মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে তার অবৈধ অর্থবাণিজ্যের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরিদর্শক আল নাঈম মুরাদ নির্মাণাধীন ভবনে পরিদর্শনে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে সামান্য ও কৃত্রিম ত্রুটি দেখিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এরপর সেই কাজ পুনরায় চালু করার শর্ত হিসেবে তিনি সরাসরি কিংবা দালালচক্রের মাধ্যমে ভবন মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। দাবি পূরণ না হলে উচ্ছেদ, জরিমানা ও মামলা দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় রাজউকের ভবন নির্মাণ নীতিমালাকে উপেক্ষা করে চলছে অবাধ অনিয়ম। নকশা বহির্ভূত ডেভিয়েশন, রাস্তার প্রশস্ততা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন, ইনডোর-আউটডোর অবকাঠামো পরিবর্তন, এমনকি আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
রাজউক এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করলেও, রহস্যজনক লেনদেনের মাধ্যমে সেসব নোটিশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
অনুসন্ধানে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট স্থানে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে-
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া
মো. লুৎফর রহমান গং (অবসরপ্রাপ্ত রেল মাস্টার) কোনো অনুমোদিত প্ল্যান ছাড়াই শুধুমাত্র ‘ছাড়পত্র’-এর ভিত্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। ইতোমধ্যে তৃতীয় তলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ (সংশোধিত) এর ৩(খ) ধারায় বাধ্যতামূলক ৪০% খোলা জায়গা রাখা হয়নি। সাইটে নেই অনুমোদন বোর্ড, নিরাপত্তা নেট বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা যা জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
হাজী আব্দুল কাদের মোল্লা টাওয়ার, সতিশ সরকার রোড
সাফা প্রোপারটিজ নামক একটি ডেভেলপার কোম্পানি মাত্র ৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তার ওপর বহুতল ভবন নির্মাণ করছে।
ডিস্টিলারি রোড, গেন্ডারিয়া
এল.এইচ প্রোপারটিজ লিমিটেডের মালিক মো. আকবর হোসেন কোনো অনুমোদিত প্ল্যান ছাড়াই ৬ ফুট রাস্তার ওপর ৮ তলা ভবন নির্মাণ করছেন।
রজনী চৌধুরী রোড, গেন্ডারিয়া
সরু গলির মধ্যে নিজের ইচ্ছামতো নির্মাণকাজ চলছে। রাজউক নির্মাণ আইন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত, নেই অনুমোদন বোর্ড।
এছাড়াও ৫০ এস.কে দাস রোড (ব্যাটারি গলি), ২ নং ফরাসগঞ্জ, সূত্রাপুর (নাজিমা গং), দ্বীননাথ সেন রোড (হাজী মনিরুজ্জামান গং) এবং মীরহাজীবাগ, শ্যামপুর এলাকায় একই ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ঘুষের সরাসরি অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভবন মালিক জানান, তার ভবনে ত্রুটি দেখিয়ে এবং উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে ইমারত পরিদর্শক আল নাঈম মুরাদ ভবন মালিককে অফিসে ডেকে মোটা অংকের ঘুষ দাবী করেন। পরবর্তীতে তার সহকারি রাকিবের মাধ্যমে ২ লক্ষ টাকা ঘুষ আদায় করে দফারফা করেন।
এছাড়া ২৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুরপাড় এলাকায় একটি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে একাধিক ভবন মালিকের কাছ থেকে ঘুষ বাণিজ্য করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নগর পরিকল্পনা বিপর্যস্ত, ঝুঁকিতে জননিরাপত্তা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজউকের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদেই পুরান ঢাকায় অবৈধ বহুতল ভবনের ছড়াছড়ি। এতে নগর পরিকল্পনা ধ্বংসের মুখে পড়ছে, বাড়ছে অগ্নি ও ভূমিকম্প ঝুঁকি, আর প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষের জানমাল।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং অবৈধ ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
অভিযুক্ত ইমারত পরিদর্শক আল নাইম মুরাদকে মুঠোফোনে কল করে অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তো বদলি হয়ে গেছি এখন আমাকে এই ব্যাপারে যুক্ত করে লাভ কী? পরবর্তীতে তিনি কোন কথা না বলে ফোন রেখে দেন এবং বন্ধ করে দেন।
এ ব্যাপারে রাজউকের অথোরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেন কে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত