চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ
ভোক্তাপর্যায়ে অস্থির বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার নিয়ন্ত্রণে মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। চলতি জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গত মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫) ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। তবে সরকারের নির্ধারিত এই দামকে তোয়াক্কাই করছে না চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা।
খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৭-৮শ’ টাকা বেশি দামে। কিছু কোম্পানির গ্যাস কম দামে বিক্রি হলেও (বিএম গ্যাসের) সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে অতিরিক্ত ৪-৫শ’ টাকা দামে। অর্থাৎ বাজারে সর্বোচ্চ দামেই বিক্রি হচ্ছে কোম্পানিটির ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। শুধু বাড়তি দামই নয়, পণ্য কিনতেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে বেশকিছু অনৈতিক শর্ত। নিজ ব্র্যান্ডের খালি বোতল ছাড়া দেওয়া হচ্ছে না গ্যাস। অনেক ক্ষেত্রে পাইকারি দোকানিদের কাছ থেকে চাওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকাও। যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪-৫শ’ টাকা বাড়তি নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটিও। তবে ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটর থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত যত হাতে ঘুরছে, পণ্যের দাম ততই বাড়ছে। এতে বিএম গ্যাস মালিকপক্ষের করার কিছুই নেই বলে দাবি তাদের। তবে নির্বাচনের চাপে প্রশাসনের নজরদারির কমতি থাকার সুযোগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা এমন নৈরাজ্য করছে বলে অভিযোগ করেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
অন্যদিকে আমদানিতে কোনো ঘাটতি না থাকলেও ডিলার ও মধ্যসত্ত্বভোগীদের কার্যক্রম এবং দুর্বল তদারকির কারণে এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)। আর চট্টগ্রাম এলপিজি সরবরাহ সমিতির দাবি, খালি সিলিন্ডার রিফিলিং জটিলতা ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাই বাজার অস্থিরতার মূল কারণ। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন জানায়, আমরা বিষয়টি খবর পেয়েছি। খুব দ্রুতই এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
নগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট, ষোলশহর, কাজীর দেউড়ি, এনায়েত বাজার ও ২ নম্বর গেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় বিএম গ্যাসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেশি। ১২ কেজি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে বিএম গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকায়, যেখানে একই সময়ে ওমেরা, ফ্রেশ, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, আই গ্যাসের সিলিন্ডার মিলছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। চকবাজারের তেলপট্টি এলাকার সাহেদ এন্টারপ্রাইজে বিএম গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়, অথচ একই দোকানে ওমেরা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯৫০ টাকায়, আই গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ টাকায়।
অন্যদিকে বহদ্দারহাটের রাইসা ট্রেডার্সে বিএম গ্যাসের দাম ১ হাজার ৯৫০ টাকা, সেখানে ফ্রেশ কোম্পানির গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। এছাড়া অন্য ব্র্যান্ড মিলছে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। ষোলশহরের জিহান এন্টারপ্রাইজে বিএম গ্যাস ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও অন্যান্য ব্র্যান্ড পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, দামের পাশাপাশি বিএম গ্যাসের ডিলাররা অনৈতিক শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। সোহেল এন্টারপ্রাইজের মালিক জানান, শুধুমাত্র বিএম গ্যাসের নিজস্ব খালি সিলিন্ডার থাকলেই রিফিল দেওয়া হচ্ছে। অন্য কোম্পানির বোতল থাকলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা বলেন, আমাদের জোর করে তাদের বোতল রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি বাজার দখলের কৌশল। এতে আমরা বিকল্প ব্র্যান্ড বিক্রি করতেও সমস্যায় পড়ছি।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় কথা হয় গ্যাস কিনতে আসা রহিম এর সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি বলেন, চাকরি করে মাত্র অল্প ক’টাকা বেতন পাই। কিন্তু গ্যাস কোম্পানিগুলো এমন নৈরাজ্যে অসহ্য লাগছে। গতমাসেও যে গ্যাস ১৪শ’ টাকা দিয়ে কিনেছি এবার তা ২ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।
একই কথা জানান চকবাজার এলাকার টং দোকানি ফয়েজ। তিনি বলেন, আগে একটি গ্যাস আনলে যেই টাকা খরচ হত, এখন তাতে আরও বেশি ৫শ’ টাকা খরচ হচ্ছে। এতে চা বিক্রি করে যেই টাকা আয় হচ্ছে তার চেয়ে আরও বেশি খরচ হচ্ছে। হঠাৎ করে দোকানিরা যেভাবে টাকা চাইছেন, মনে হচ্ছে কোথাও কোনো নিয়ম নেই। তবে বিএম গ্যাসের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কোম্পানির বিক্রয় ব্যবস্থাপক ইশাক আরমান। তিনি বলেন, ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৩৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামের জন্য আমরা দায়ী না। আমরা তো খুচরা বিক্রিতাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এখানে বাজার অস্থিরতার পেছনে মধ্যসত্ত্বভোগী ও রিটেইলাররাই বেশি দায়ী। আমরা যদি বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করি, তাহলে আপনারা আমাদের প্রশ্ন করতে পারবেন।
চট্টগ্রাম এলপিজি সরবরাহ সমিতির সভাপতি খোরশেদুর রহমান বলেন, দেশে গ্যাসের কোনো ঘাটতি নেই। গত মাসে ফ্রেশ, ওমেরা, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, আই গ্যাস ও বিএম এই ছয়টি কোম্পানি প্রায় দেড় লাখ টন এলপিজি আমদানি করেছে। তার মতে, খালি সিলিন্ডার রিফিলিং জটিলতা ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাই বাজার অস্থিরতার মূল কারণ। আমি মনেকরি, সরকারের নতুন আরও গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া উচিত। মাঝখানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি আমরা পজিটিভলি দেখছি। তবে যারা অভিজ্ঞ, তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত। এছাড়া যাদের গ্যাস আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাদেরও বেশি বেশি সুযোগ দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে বাজারের বর্তমান অস্থিরতার জন্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং দুর্বল তদারকিকে দায়ী করেছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। সংগঠনটির সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ চেইনের পরিবর্তনের প্রভাব দেশীয় এলপিজি বাজারেও পড়ছে। তবে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি বাড়ানো উচিত। এসবের অভাব থাকাতেই অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে তো আমাদের সেভাবে নজরদারির সুযোগ নেই। ফলে তা প্রশাসনেরই দায়িত্ব।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বিষয়টিকে পরিকল্পিত মুনাফা লাভের কৌশল হিসেবে দেখছে। ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এলপিজি আমদানিতে অন্তত এক মাস সময় লাগে। যদি প্রকৃত সংকট থাকত, তাহলে আগেই তার ইঙ্গিত মিলত। হঠাৎ করে সিলিন্ডার উধাও হওয়া স্পষ্টতই কৃত্রিম সংকট। ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান এলেই দোকান বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়। এটি আইনের প্রতি অবমাননা। মালিক পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু প্রশাসন নীরব। এই মালিকগুলোর যখন পেট ভরবে, তখনই তারা থামবে। আর না হয় সাধারণ মানুষের এমন ভোগান্তি কোনো দিনও থামবে না।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, এলপিজি বাজারের অস্থিরতার বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকেও ইতোমধ্যে বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা বাজার অস্থিরতার পেছনে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করব। কেউ যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে আমাদের এসব অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য জানান তাহলে আমাদের কাজটা সহজ হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত