স্টাফ রিপোর্টার॥
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, দালালচক্র ও ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ—এই তিনটি সেবা ঘিরেই মূলত গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অবৈধ নেটওয়ার্ক। সাম্প্রতিক সময়ে বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয়ে কর্মরত এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সেই পুরোনো অভিযোগগুলোকেই আরও ভয়াবহভাবে সামনে এনে দিয়েছে। অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার নাম সৌরভ কুমার সাহা। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ২৬–২৭ হাজার টাকা বেতনের একজন সরকারি কর্মকর্তা গত ১১ বছরে অবৈধ উপায়ে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন।
ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা সৌরভ কুমার সাহার পারিবারিক পটভূমি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। স্থানীয় সূত্র জানায়, তার বাবা বিজয় কৃষ্ণ সাহা পেশায় ছিলেন পত্রিকার হকার। সামান্য আয়ের কারণে পরিবার পরিচালনায় ছিল চরম টানাপোড়েন। তবে সময়ের ব্যবধানে এই পরিবারের জীবনযাত্রায় আসে আমূল পরিবর্তন, যা অনেকের কাছেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, আওয়ামী পরিবারের সদস্য হওয়ায় এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সুপারিশে ২০১৪ সালে বিআরটিএ অফিসে চাকরি পান সৌরভ কুমার সাহা। তার প্রথম কর্মস্থল ছিল নোয়াখালী। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দ্রুত উত্থান।
চাকরির অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে বিআরটিএর পরিদর্শক হন। এরপর উত্তরা, গোপালগঞ্জ, চাঁদপুর, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০২৩ সালের শুরুতে মাদারীপুর থেকে বদলি হয়ে বরিশাল বিআরটিএ অফিসে যোগ দেন তিনি। সূত্রের দাবি, চাকরির এই ১১ বছরে সৌরভ সাহা নিজের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী দালালচক্র গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে ঘুষ আদায় করা হতো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিশাল বিআরটিএর অধীনে প্রতি মাসে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার জন্য ছয় থেকে আটটি বোর্ড বসে। প্রতিটি বোর্ডে লিখিত, মৌখিক ও মাঠ পরীক্ষায় অংশ নেন গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ জন আবেদনকারী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ আবেদনকারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অকৃতকার্য দেখানো হয়। পরে বিআরটিএর চিহ্নিত দালাল ও সৌরভ সাহার ব্যক্তিগত ড্রাইভার রিয়াজ খানসহ আলাউদ্দীন, জাকির, আসাদুল, হৃদয় প্রমুখ পরীক্ষায় ফেল করা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাস করিয়ে দেওয়ার নামে তিন থেকে চার হাজার টাকার চুক্তি করা হয়। এর মধ্যে লাইসেন্সপ্রতি আড়াই হাজার টাকা সরাসরি সৌরভ সাহাকে দিতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি টাকা দালালদের মধ্যে ভাগ হয়ে যেত।
নিয়ম অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার সময় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত না থেকেও পরীক্ষা সম্পন্ন করা হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিনিধি পাঠিয়ে কাজ শেষ করতেন কিংবা পরে তালিকায় স্বাক্ষর দিতেন। এতে করে সৌরভ সাহা নিজের তৈরি করা পাসের তালিকায় সহজেই স্বাক্ষর করিয়ে নিতে পারতেন। অভিযোগ রয়েছে, এই পাস বাণিজ্যে বিআরটিএর পরিদর্শক সৌরভ সাহা ও ট্রাফিক পরিদর্শকদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ ছিল।
লাইসেন্স ছাড়াও যানবাহন রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ ছিল সৌরভ সাহার অবৈধ আয়ের বড় উৎস। সূত্র অনুযায়ী, একটি সিএনজি অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশনের জন্য ফাইলপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। প্রতিটি ট্রাকের রেজিস্ট্রেশনের জন্য পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন শোরুমের মোটরসাইকেলের ফাইলপ্রতি নেওয়া হতো এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার ও সিএনজির ফিটনেস সনদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, প্রতি বোর্ড থেকেই সৌরভ সাহা পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ আয় করতেন। এভাবে মাসে তার অবৈধ আয় দাঁড়াত ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকায়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে সিএনজি অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশন নিয়ে। সূত্র জানায়, গত বছর বিআরটিএর প্রধান কার্যালয় থেকে সিএনজির টাইপ অনুমোদন পাওয়ার আগেই সৌরভ সাহা ১৯১টি সিএনজির রেজিস্ট্রেশন দেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি সিএনজি থেকে তিনি ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে বরিশালের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তা রাজকুমার সাহা বাদী হয়ে সৌরভ কুমার সাহাকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিআরটিএর সহকারী পরিচালক রোকনুজ্জামান এবং ঢাকার তেজগাঁও এলাকার ‘রানার অটো’-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলামকেও আসামি করা হয়। মামলায় বলা হয়, পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মামলার পর সৌরভ গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্যজনকভাবে তিনি জামিনে মুক্ত হন, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে সৌরভ সাহার বিপুল সম্পদের চিত্রও উঠে এসেছে। সূত্র অনুযায়ী, তার রয়েছে ১০টি বাস, চারটি প্রাইভেট কার এবং একাধিক সিএনজি অটোরিকশা। নিজের চলাচলের জন্য তিনি ব্যবহার করেন প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ি। বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় রয়েছে ‘হাওলাদার পরিবহন’-এর একটি বাস কাউন্টার। মাদারীপুরের টেকেরহাট এলাকার হিরো হাওলাদার ও মনির হাওলাদারের কাছ থেকে চার বছর আগে এই পরিবহনের রুট কেনা হয়। তারা জানান, কাগজে-কলমে মালিকানা সৌরভের বাবা ও শ্বশুরের নামে থাকলেও অর্থ লেনদেন থেকে শুরু করে সবকিছুই পরিচালনা করেন সৌরভ নিজেই।
হাওলাদার পরিবহনের মোস্তফাপুর স্ট্যান্ডের চেকার জাহাঙ্গীর এবং সহকারী ম্যানেজার প্রদীপ কুমার বাড়ৈও জানিয়েছেন, পরিবহনটির প্রকৃত মালিক সৌরভ সাহা। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হাওলাদার পরিবহনে সৌরভের পাঁচটি বাস রয়েছে। এছাড়া আশিক পরিবহনের ব্যানারে চারটি এবং ফরিদপুর বাস মালিক সমিতির অধীনে একটি বাস চলাচল করছে। এর মধ্যে ছয় মাস আগে দুটি নতুন বাস কেনা হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
সৌরভ সাহার ঘুষবাণিজ্যের অন্যতম সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে তার ব্যক্তিগত ড্রাইভার রিয়াজ খানের নাম। রিয়াজের নামে একটি বাস রেজিস্ট্রেশন করা হলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সেটির প্রকৃত মালিক সৌরভ নিজেই। বরিশাল ইফাদ মোটরস থেকে কিস্তিতে কেনা একাধিক গাড়ির ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ রয়েছে। কাগজে এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন কোম্পানির নামে থাকলেও কিস্তির টাকা পরিশোধ করা হতো রিয়াজ খানের মাধ্যমে সৌরভ সাহার অর্থে।
লাইসেন্স পরীক্ষার মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র দেখতে ২৯ সেপ্টেম্বর বরিশাল নথুল্লাবাদ বিআরটিসি বাস কাউন্টারে উপস্থিত হন এ প্রতিবেদক। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাঠ পরীক্ষা শুরু হয়। সেখানে সরাসরি ৬১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও মাত্র তিনজনকে পাস দেখানো হয়। সে সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন না। মোটরসাইকেল লাইসেন্স পরীক্ষায় কেবল ট্রাফিক ইন্সপেক্টর কেএম রহমান এবং বিআরটিএর ইন্সপেক্টর সৌরভ সাহা উপস্থিত ছিলেন। পরে বিকেলে চার চাকার গাড়ির পরীক্ষার সময় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত হলেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল হাতেগোনা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সৌরভ কুমার সাহা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার বাবার নামে একটি বাস রয়েছে এবং সেটি ফরিদপুর বাস মালিক সমিতির অধীনে চলাচল করে। তার পিতার একটি রেন্ট-এ-কার ব্যবসা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি যে প্রাইভেট কার ব্যবহার করেন, সেটিও তার বাবার নামে রেজিস্ট্রেশন করা। হাওলাদার পরিবহন বা আশিক পরিবহনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন সৌরভ। আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে গাড়ি কেনা বা সম্পদ গড়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
তবে অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং একাধিক সূত্রের বক্তব্য এসব অস্বীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে সীমিত বেতনে এত বিপুল সম্পদের মালিক হন, সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। সৌরভ কুমার সাহার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত