এম ইদ্রিস আলী
সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চৌধুরীপাড়ায় ন্যাচারাল হেলথ সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে ঘিরে চিকিৎসাসেবার আড়ালে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে অভিনব প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে নিজেকে ডাক্তার হিসেবে পরিচয়দানকারী হাফিজুর রহমান নানা জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা ও সুস্থতার নিশ্চয়তার প্রচারণা চালিয়ে রোগীদের আকৃষ্ট করছেন।
পরে সাশ্রয়ী মূল্যের চিকিৎসাসেবার প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এমন ব্যবস্থাপত্র, যার ওষুধ নির্দিষ্ট ওই প্রতিষ্ঠান থেকেই কিনতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ডায়াবেটিস থেকে হৃদরোগ, হার্ট ব্লক, পিত্তথলি ও কিডনির পাথর, সিস্ট ও টিউমার, নাকের পলিপাস, টনসিল, পাইলস, ফিস্টুলা ও এনাল ফিসারসহ প্রায় সব ধরনের রোগের সুস্থ সমাধান দেওয়ার দাবি করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এসব দাবি ও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে দূরদূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ সেখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রক্তে শর্করা ও দীর্ঘমেয়াদি শর্করার মাত্রা, রক্তে প্রদাহ, কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা, কোলেস্টেরল, রক্তের লবণ ও খনিজ, থাইরয়েড, ভিটামিন এবং ইউরিক এসিড পরীক্ষাসহ শরীরের নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্রস্রাব ও মল পরীক্ষা, হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন পরীক্ষা, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান ও এমআরআইসহ শরীরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার কথাও প্রচারণায় উল্লেখ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এখানেই শেষ নয়। সংক্রামক রোগ, ডেঙ্গু, ভাইরাসজনিত যকৃতের রোগ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এমন ভাইরাস, যক্ষ্মা, রক্তে জীবাণু শনাক্তকরণ, বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা, এমনকি ক্যানসার ও জটিল রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার কথাও প্রচারণায় তুলে ধরা হচ্ছে।
টিস্যু পরীক্ষা, সূক্ষ্ম সূচের মাধ্যমে কোষ সংগ্রহ, এন্ডোস্কোপি, কোলনোস্কোপি এবং ক্যানসারের বিশেষ রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষার মতো জটিল পরীক্ষার কথাও বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য,
একটি ন্যাচারাল হেলথ সেন্টার কীভাবে মানবদেহের প্রায় সব রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়? এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নিবন্ধন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দক্ষ জনবল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীরা জানান, প্রথমে রোগীদের সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসার প্রলোভন দেখানো হলেও পরে ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। আর সেই ওষুধ অন্য কোথাও থেকে নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকেই কিনতে হবে এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, পুরো কার্যক্রমকে নির্বিঘ্ন রাখতে সেখানে নির্দিষ্ট কিছু দালালও কাজ করছে। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী সংগ্রহ, রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রতিষ্ঠানমুখী করতে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় রঙিন লিফলেট, ফেস্টুন ও ব্যানার টানিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
নানা জটিল রোগের চিকিৎসা ও সুস্থতার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের রোগে ভোগা, আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও সহজ-সরল মানুষকে লক্ষ্য করেই এ প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ন্যাচারাল হেলথ সেন্টার নামের কার্যক্রমটি বাংলাদেশ নারী অধিকার উন্নয়ন সংস্থার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তবে একটি নারী অধিকার উন্নয়ন সংস্থার পরিচয় বা সাইনবোর্ডের সঙ্গে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের সম্পর্ক কী, এবং এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার আইনগত অনুমোদন রয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, চিকিৎসা মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তাই সব রোগের চিকিৎসা, জটিল রোগের সমাধান কিংবা সুস্থতার নিশ্চয়তা ধরনের প্রচারণার আড়ালে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রোগীদের বিভ্রান্ত করছে কি না, তা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করুক। প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা, চিকিৎসকের প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিবন্ধন, রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতির অনুমোদন, ব্যবস্থাপত্র প্রদানের আইনগত ক্ষমতা এবং ওষুধ বিক্রির বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা হোক।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে চিকিৎসার নামে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এ বিষয়ে অভিযুক্ত ন্যাচারাল হেলথ সেন্টারের হাফিজুর রহমানের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, চিকিৎসকের বৈধ নিবন্ধন এবং প্রযোজ্য আইন ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের বাইরে গিয়ে চিকিৎসাসেবা, রোগ নির্ণয় কিংবা জনসাধারণকে বিভ্রান্তিকর প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরিচয়, যোগ্যতা, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও সেবার বৈধতা সম্পর্কে সচেতন থাকারও পরামর্শ দেন তিনি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত