ডেস্ক রিপোর্টঃ
দেশজুড়ে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। রাজধানীর পল্লবীর ৮ বছরের শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ ধরনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সারা দেশের ৭২টি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে এ-সংক্রান্ত মামলা ও স্পর্শকাতর মামলাগুলোর তালিকা প্রস্তুত করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তালিকা অনুযায়ী, এসব ট্রাইব্যুনালে ২০ হাজার ৭৭২টি শিশু হত্যা ও ধর্ষণ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৪ মে একটি জাতীয় দৈনিকে আছিয়া থেকে রামিসা; শিশু ধর্ষণ হত্যায় খালাস পাচ্ছে ৭০ ভাগ আসামি’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ওই রিপোর্ট আমলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাগিদ দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠির পর আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রথমে সারা দেশের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন মামলার তালিকা তৈরি করে। বিভাগভিত্তিক এ তালিকা থেকে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে সবচেয়ে বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ বিভোগে মোট ৬ হাজার ২২৮টি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা এবং ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন। এরপরই সবচেয়ে বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচার কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে এবং দ্রুত বিচার শেষ করতে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর শাখা থেকে চিঠি পাঠিয়ে সারা দেশের পিপিদের (পাবলিক প্রসিকিউটর) নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সময়মতো সাক্ষী হাজির করার নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই এ চিঠি পাঠানো হতে পারে। পাশাপাশি যেসব আদালতে বিচারক সংকট এবং নিয়মিত পিপির সংকট রয়েছে, সেগুলো পূরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। সব বিবেকবান হৃদয়কে নাড়া দেয়। এরপর নড়েচড়ে বসে সবাই। মাত্র ছয় কার্যদিবসে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করে নতুন ইতিহাস গড়ে সরকার। ওই মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এ মামলাটি শুধু একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়। এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এরপর উচ্চ আদালত থেকে রামিসার মামলাটিসহ স্পর্শকাতর নারী ও শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে আলাদা বেঞ্চ গঠন করা হয়। এরই মধ্যে রামিসা হত্যা, মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলাসহ এ ধরনের অনেক স্পর্শকাতর মামলার পেপারবুক প্রস্তুত হয়েছে। শিগগির এসব মামলা উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হবে।
এদিকে দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। গত এপ্রিল মাসে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বিগত তিন মাসের শিশু অধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এইচআরএসএসের তথ্যমতে, তিন মাসে মোট ৩২৮ শিশু সরাসরি নির্যাতনের শিকার হয়। নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে ১৩৮ জন (প্রায় ৪২ শতাংশ) প্রাণ হারায়। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৪৬ শিশু নিহত হয়। ধর্ষণের শিকার মোট নারী ও কন্যার মধ্যে ৭৬ জনই শিশু-কিশোরী, যা মোট ধর্ষণের ৫২ শতাংশ। এরই মধ্যে গত ১৪ জুন ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় ৫ বছর বয়সী এক শিশুকে চারজন মিলে ধর্ষণ ও হত্যা করে কংস নদে ফেলে দেয়। পরে তার লাশ ভেসে ওঠে। গতকাল এ মামলায় সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। বিচার শেষ পর্যায়ে। ঘটনার মাত্র এক মাসের মধ্যেই এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এর আগে নোয়াখালীর চাটখিলে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে গত সোমবার শাহাদাত হোসেন নামের এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই দিনে খাগড়াছড়ির রামগড়ে সাত বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ মামলায় ৫৫ বছর বয়স্ক মো. শাহিনকেও দেওয়া হয়েছে একই শাস্তি। গত সোমবার এক দিনে সারাদেশের তিন জেলায় শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার বিচার করে মোট ৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চারদিকে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচারে গতি আসতে শুরু করেছে। এ ছাড়া শিশু সহিংসতাবিষয়ক মামলার যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে, তাতে রাজবাড়ির শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে ২০২৬ সালে দায়ের হওয়া ছয়টি মামলা রয়েছে। ছয়টি মামলায় আট শিশু ধর্ষণের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এই আট শিশুর মধ্যে একজনের বয়স ছয় বছর, একজনের সাত বছর, দুজনের আট বছর, দুজনের ৯ বছর, একজনের ১২ বছর এবং একজনের ১৪ বছর। এমন ৫-৭ বছর বয়সী অসংখ্যা শিশু ধর্ষণের মামলা সারাদেশে বিচারাধীন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে বয়সে এসব শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল খেলার পুতুল বা স্কুলের খাতা, সেই কোমল শৈশবেই তাদের বইতে হচ্ছে ধর্ষণের নির্মম ক্ষত। আর এই ক্ষত নিয়ে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর বিচারহীনতার অন্ধকারে ঝুলে থাকছে হাজারো নিষ্পাপ জীবন। বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি আর দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা এই মামলাগুলো বিচার ব্যবস্থার এক চরম ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাকে উসকে দিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে। শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন বন্ধ করতে বিচারে দৃশ্যমান গতি আনা হচ্ছে।
জানতে চাওয়া হলে সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. শাহজাহান সাজু কালবেলাকে বলেন, প্রয়োজনীয়তার বিবেচনা থেকেই বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সারাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচারে গতি আনার জন্য আলাদা করে ৭২টি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে। এসব ট্রাইব্যুনালে এখনো অনেক সংকট রয়েছে। বিচারক সংকট, লজিস্টিক সাপোর্টের সংকট রয়েছে। এগুলো দূর করতে হবে। তাহলেই বিচারে গতি আসবে, শাস্তি দৃশ্যমান হবে। তিনি আরও বলেন, ২০০০ সালের দিকে সারা দেশে অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা বেড়ে যায়। এ অবস্থায় বিগত চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে প্রথম আইন করে। অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন এবং অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন নামে পৃথক দুটি আইন করা হয়। এ দুটি আইন ২০০২ সালে পাস করা ১ নম্বর ও ২ নম্বর আইন। এই আইন করার পর আস্তে আস্তে অ্যাডিস ও অ্যাসিড অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখন আর অ্যাসিডের কোনো অপব্যবহার আমরা দেখি না। আশা করি এই সরকার শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো স্পর্শকাতর অপরাধের ক্ষেত্রেও আইনের কঠোর প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণে আনবে। শিশু সহিংসতা ট্রাইব্যুনালের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, সরকারে উদ্যোগটা অবশ্যই আমি পজিটিভলি দেখি। তাদের এই সেন্সটা কাজ করছে যে, হ্যাঁ, এই বিষয়ে কাজ করতে হবে। তবে এই উদ্যোগগুলো সফল হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পুরো বিচার বিভাগকে ঠিকভাবে না তৈরি করবে। তিনি বলেন, কোনো সরকারই কখনো বিচার বিভাগের বিষয়ে তৎপর ছিল না। বিচার বিভাগের উন্নতিতে তেমন কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। বিচার বিভাগের বাজেটও কম রাখছে। সারা দেশে এখন ৪৭ লাখ মামলা বিচারাধীন। এই মামলাগুলোর তুলনায় বিচারক অপ্রতুল। মামলার অনুপাতে তো বিচারক লাগবে। না হলে তো মামলাজট কোনোদিনও শেষ হবে না। আগামী এক-দুই লাখ বছরেও শেষ হবে না। বিচারের গতি আনতে হলে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পুরো বিচার বিভাগের একটা পরিবর্তন আনতে হবে এবং বিচারক নিয়োগ, লজিস্টিক সাপোর্ট যেগুলো লাগে, সেগুলো দিতে হবে। ইশরাত হাসান আরও বলেন, একটা বিশেষ কোনো মামলা যেটা নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ছে বা মিডিয়ায় ফোকাসড হচ্ছে, সেই মামলা নিয়ে সরকার অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিল। এটা চার কার্যদিবসে বিচার হয়ে যাচ্ছে। তিন কার্যদিবসে তদন্ত রিপোর্ট আসছে। কিন্তু এখানে অন্য মামলাগুলোও তো একটা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে শেষ হওয়াটা প্রয়োজন। রামিসার পরিবারের মতো অন্যদের পরিবারেরও বিচার পাওয়াটা তাদের অধিকার। সেগুলো কিন্তু হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ছাড়া ইনশিওর করা সম্ভব নয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত