ডেস্ক রিপোর্টারঃ
রাজধানীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা সিটি কলেজ। শিক্ষার সুনামের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে কলেজটিতে চলেছে নিয়োগ বাণিজ্য আর লুটপাট। কলেজটির ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ হয়েছে অবৈধ উপায়ে। তাদের নিয়োগে মানা হয়নি কোনো নিয়োগ নীতিমালা। শুধু তাই নয়, ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা বৈঠকের নামে গত ৯ বছরে ‘সিটি অ্যালাউন্স’ হিসেবে নিয়েছেন প্রায় ২ কোটি টাকা। পাশাপাশি ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকির মাধ্যমে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জবাবদিহি এড়াতে এবং নিয়ন্ত্রণমুক্তভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুবিধা পেতেই একসময় কলেজটির এমপিও সুবিধা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা হয়। ফলে বছরের পর বছর সিটি কলেজ কার্যত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।
গতকাল রোববার কলেজটি থেকে নানা খাতে লুট হওয়া আড়াই কোটি টাকা ফেরত আনাসহ সংশ্লিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। তবে কলেজটি পরিদর্শন করা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ১০ হাজার ৮১১ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। প্রথমে কলেজটি সরকারি ছিল। এরপর তা এমপিওভুক্ত করা হয়। ১৯৯৯ সালে এসে এমপিও সারেন্ডার করা হয়। বর্তমানে বেসরকারি উদ্যোগেই কলেজটি পরিচালিত হচ্ছে।
১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ অবৈধ: কলেজটিতে শিক্ষক নিয়োগে নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। গভর্নিং বডি ও সিনিয়র শিক্ষকরা যে যার মতো আত্মীয়স্বজন দিয়েছেন নিয়োগ। বর্তমানে কর্মরত ১৯৮ শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ শিক্ষককেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অবৈধ উপায়ে। এর মধ্যে ১০০ শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছিল না গভর্নিং বডির অনুমোদন ও কোনো নিয়োগ বোর্ড। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছাড়া শুধু সাক্ষাৎকার নিয়েই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ১০০ শিক্ষকের মধ্যে ১৭ জন অধ্যাপক, ৩৬ জন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক আর ৪৬ জন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। এর বাইরে বাকি পাঁচজন শিক্ষককে নিয়োগে কোনো বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশ করা হয়নি। কোনো নিয়োগ বোর্ড ছাড়া তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচজনের মধ্যে একজন অধ্যাপক আর বাকি চারজন সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নীতিমালা অনুযায়ী প্রাপ্যতার অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন এ প্রতিষ্ঠানে। ডিআইএ বলছে, বিধিবহির্ভূতভাবে ৩৪ জন অধ্যাপক পদে এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন এবং তারা যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতাদি গ্রহণ করছেন।
আর্থিক খাতে যত অনিয়ম: আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও একাধিক অনিয়ম পেয়েছে ডিআইএ। ২০১২-২০১৩ অর্থবছর থেকে ২০২০-২০২১-এই নয় অর্থবছরে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যাংকে না রেখে নগদে খরচ করা হয়, যা আর্থিক বিধির লঙ্ঘন। সরকারি নির্দেশ মতে, যাবতীয় আয়, বেতন, অনুদানসহ অন্যান্য খরচ ব্যংকের মাধ্যমে খরচ করতে হবে। এ ছাড়া এ ৯ অর্থবছরে বিভিন্ন কাজের জন্য ভ্যাট কর্তন করা হয়নি। তাই বিভিন্ন কাজের ভ্যাট বাবদ ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা উৎস করও সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে।
গভর্নিং বডির সদস্যরা নিয়েছেন ২ কোটি টাকা সিটি অ্যালাউন্স গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মেরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সভায় অংশ নেওয়ার বিপরীতে ‘সিটি অ্যালাউন্স’ নামে বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী নিয়েছেন গভর্নিং বডির সদস্যরা। এ ৯ অর্থবছরে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সিটি অ্যালাউন্স নিয়েছেন তারা। অথচ সরকার সাফ জানিয়েছে, সারা দেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজগুলো থেকে নিতে পারবেন না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ অর্থ উত্তোলনকে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত উল্লেখ করে পুরো অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে জমার চালানের কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা সভায় অংশগ্রহণের নামে নিয়মিত এভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করায় কলেজটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষা কার্যক্রমের উন্নয়নের পরিবর্তে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জন্য বিধিবহির্ভূত ভাতা চালু হওয়ায় কলেজের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
শিক্ষা কার্যক্রমেও অসন্তোষ
আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ডিআইএ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীর হার সন্তোষজনক নয়। এ ছাড়া কলেজের গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বই নেই। সহশিক্ষা কার্যক্রমও সীমিত। শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নে লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করা, সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ একাধিক সুপারিশ করেছে ডিআইএ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, নিয়মানুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। তবে ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী নিয়ামুল হক এ প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: কে এম মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ মাসুদ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২১/১ নয়াপল্টন (মসজিদ গলি),ঢাকা - ১০০০।
✆ ০১৫১১৯৬৩২৯৪, ০১৬১১৯৬৩২৯৪ 📧dailysobujbangladesh@gmail.com.
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত